মাদারীপুরের শিবচরে গণ-উন্নয়ন বহুমুখী সমবায় সমিতির বিরুদ্ধে ঋণের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, অনিয়ম, চক্রবৃদ্ধি সুদ, ব্ল্যাংক চেক গ্রহণ, মামলা দিয়ে হয়রানি ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করেছেন ভুক্তভোগী গ্রাহকেরা। বুধবার শিবচর উপজেলা পরিষদের সামনে এ কর্মসূচি শুরু হয়। এতে নারী-পুরুষসহ প্রায় শতাধিক ভুক্তভোগী অংশ নেন।
গণ উন্নয়ন বহুমুখী সমবায় সমিতির বিরুদ্ধে অনশন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ভুক্তভোগীদের অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে তাদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন। তাদের অভিযোগ, দরিদ্র ও স্বল্পশিক্ষিত মানুষ হওয়ায় সংসারের প্রয়োজন মেটাতে তারা গণ-উন্নয়ন বহুমুখী সমবায় সমিতি থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। নিয়মিত কিস্তি পরিশোধের পর কোনো কারণে এক-দুই কিস্তি পরিশোধে বিলম্ব হলে তাদের ওপর অতিরিক্ত অর্থের চাপ সৃষ্টি করা হয়। পরে মূল ঋণের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি টাকা দাবি করে মামলা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
তারা আরও অভিযোগ করেন, ঋণ নেওয়ার সময় কোনো কোনো গ্রাহকের কাছ থেকে ব্যাংকের স্বাক্ষর করা বা কথিত ‘ব্ল্যাংক চেক’ জামানত হিসেবে নেওয়া হয়েছে। ঋণ পরিশোধের পরও এসব চেক ফেরত দেওয়া হয়নি বলেও কয়েকজন অভিযোগ করেন। পরবর্তী সময়ে এসব চেক ব্যবহার করে মামলা বা আইনি জটিলতায় ফেলার আশঙ্কার কথাও জানান তারা।
ভুক্তভোগীদের দাবি, ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পারলে কিংবা নির্ধারিত সময়ে কিস্তি দিতে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে। এসব মামলায় অনেককে পুলিশি হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন গ্রাহক কারাগারে রয়েছেন বলেও দাবি করেন অনশনকারীরা।
তাদের অভিযোগ, মামলার পর দাবি করা অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ না করলে জামিন পেতেও নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সমিতির লোকজনের চাপ এবং মামলা-গ্রেপ্তারের আতঙ্কে অনেক পরিবার স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছে না বলেও জানান তারা।
অনশনে অংশ নেওয়া এক ভুক্তভোগী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, গণ-উন্নয়ন আমাদের শেষ করে দিয়েছে। আমি এখন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরি। আমার বউ-বাচ্চা চলে গেছে। ঋণের চিন্তায় আমার মা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, সমিতির প্রতিষ্ঠাতা আবুল হাশেম মিয়া বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেছেন।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, যে ঋণ একসময় তাদের কাছে সংসারের অভাব মোকাবিলার ‘বাঁচার অবলম্বন’ ছিল, সেই ঋণের বোঝাই এখন তাদের অনেকের কাছে বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মামলা ও অতিরিক্ত অর্থের দাবিতে কেউ কেউ আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন বলেও তারা দাবি করেন।
অনশনকারীরা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে গণ উন্নয়ন বহুমুখী সমবায় সমিতির বিরুদ্ধে চক্রবৃদ্ধি সুদ, ঋণের বিপরীতে ব্ল্যাংক চেক গ্রহণ এবং মূল ঋণের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি অর্থ দাবি করে মামলা করার মতো অভিযোগ রয়েছে।
তাদের দাবি, সমিতির ঋণ কার্যক্রমের অনিয়ম তদন্ত করে দেখতে হবে। অতিরিক্ত অর্থের মামলা বন্ধ, হয়রানিমূলক ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং গ্রাহকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
ভুক্তভোগীরা বলেন, তারা ঋণের টাকা পরিশোধ করতে চান। তবে মূল ঋণ ও বৈধ হিসাবের বাইরে অতিরিক্ত অর্থের চাপ এবং মামলা দিয়ে হয়রানি বন্ধ করতে হবে। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
শিবচরের কাঠালবাড়ি ইউনিয়নের ভুক্তভোগী হাসান মৃধা দাবি করেন, ২০২১ সালে বিদেশ যাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি গণ-উন্নয়ন সমবায় সমিতি থেকে ২ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। তার দাবি, পরবর্তীতে তিনি ঋণের টাকা পরিশোধ করেছেন। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে প্রতিষ্ঠানটি তার কাছে এখনও টাকা পাওনা রয়েছে বলে দাবি করছে।
হাসান মৃধা বলেন, ‘আমি ২০২১ সালে গণ-উন্নয়ন থেকে ২ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলাম এবং সেই টাকা পরিশোধ করেছি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠান থেকে বলা হচ্ছে, আমার কাছে তারা টাকা পায়। আমার প্রশ্ন হলো, ২০২৬ সালে এসে কীভাবে আমার কাছে এখনো টাকা পাওনা থাকে? আমি এই হয়রানির বিচার চাই।’ তার দাবি, এলাকার আরও অনেক পরিবার একই ধরনের আর্থিক জটিলতায় পড়েছেন।
অনশন কর্মসূচির খবর পেয়ে শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে উপস্থিত হন। তিনি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের অভিযোগ শোনেন।
এ সময় ইউএনও ভুক্তভোগীদের অভিযোগগুলো লিখিত আকারে উপজেলা প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর উপজেলা সমবায় কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি কীভাবে দ্রুত সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অনশন ও অবস্থান কর্মসূচির খবর পেয়ে মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনের সংসদ সদস্য পীরজাদা সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তিনি ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের অভিযোগ শোনেন।
এ সময় তিনি সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। আগামী ১৫ তারিখে তদন্তের আগে ভুক্তভোগীদের যেন কোনো ধরনের হয়রানি বা গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হতে না হয়, সে বিষয়ে পুলিশ সুপার (এসপি) ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) বলবেন বলেও জানান তিনি। তবে তদন্তের ফলাফল না পাওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না যাওয়ার কথাও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগের বিষয়ে গণ-উন্নয়ন বহুমুখী সমবায় সমিতির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল হাশেম মিয়া বলেন, অভিযোগকারীদের অধিকাংশ অভিযোগই মিথ্যা। টাকা নিয়ে যদি টাকা পরিশোধ না করে, তাহলে মামলা তো দেবই। আর মামলা করে উকিল কত টাকার মামলা করেছে, সে বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। এসব মামলার বাদী হন ব্রাঞ্চ ম্যানেজার।
আবুল হাশেম মিয়া আরও বলেন, বর্তমানে সমিতির প্রায় শতাধিক গ্রাহকের বিরুদ্ধে মামলা চলমান রয়েছে। কারও কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকলে সমিতির কার্যালয়ে এসে তা জানালে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হবে বলেও জানান তিনি।
আন্দোলনকারীরা বলছেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে ঋণের বোঝা, মামলা ও নানা ধরনের হয়রানির মধ্যে রয়েছেন। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে দ্রুত সমস্যার সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
তাদের মূল দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে গণ উন্নয়ন বহুমুখী সমবায় সমিতির ঋণ কার্যক্রমের অনিয়ম তদন্ত, ঋণের তুলনায় অতিরিক্ত অর্থ দাবি করে মামলা বন্ধ, হয়রানিমূলক ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, গ্রাহকদের কাছ থেকে নেওয়া ব্ল্যাংক চেকের বিষয়ে তদন্ত এবং ঋণগ্রহীতাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা।
প্রশাসন জানিয়েছে, ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সমবায় কর্মকর্তা ও সমিতি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। ফলে এখন সবার নজর প্রশাসনিক তদন্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন অভাবের সময়ে যে ঋণ ছিল সংসার চালানোর অবলম্বন, সেই ঋণই যদি মামলা, অতিরিক্ত অর্থের দাবি ও হয়রানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়? তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে এবং ভুক্তভোগীদের দাবি ও সমিতির বক্তব্য দুই পক্ষেরই সত্যতা যাচাই হবে, এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

-18a537-720x405.webp)