দেশজুড়ে যখন শীতের হাওয়া বইছে, তখন ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জে ভালোভাবেই অনুভূত হচ্ছে নির্বাচনি উত্তাপ। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জেলাজুড়ে তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ, প্রত্যাশা ও অনিশ্চয়তা। দীর্ঘ ১৬ বছর আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র প্রভাবের পর এবার তাদের অনুপস্থিতিতে মাঠে নেমেছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ একাধিক দল।
১ হাজার ৩৭৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের মানিকগঞ্জ সাতটি উপজেলা ও দুটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। জেলার তিনটি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার ১৩ লাখ ৩৬ হাজার ৩৮০ জন। ২০০৮ সালের আগে জেলায় বিএনপির আধিপত্য থাকায় একসময় মানিকগঞ্জ পরিচিত ছিল ‘ধানের শীষের ঘাঁটি’ হিসেবে। তবে নবম সংসদ নির্বাচনের পর থেকে টানা ১৬ বছর এ জেলা ছিল আওয়ামী লীগের দখলে।
এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে যাচ্ছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন ইসলামিক ও জাতীয়তাবাদী দলের মধ্যে—এমনটাই মনে করছেন সাধারণ ভোটাররা। জেলা শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত চলছে প্রার্থীদের গণসংযোগ, উঠান বৈঠক, পথসভা ও ঘরে ঘরে ভোট চাওয়ার ব্যস্ততা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারেন নতুন ভোটাররা। কারণ প্রায় তিন লাখ তরুণ এবার প্রথমবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। দীর্ঘদিন ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পারার ক্ষোভ ও প্রত্যাশা তাদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তরুণদের আলোচনা-সমালোচনা চোখে পড়ছে।
স্থানীয় ভোটারদের ভাষ্য, উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগব্যবস্থা ও স্থানীয় সমস্যার সমাধান—এই বিষয়গুলোই প্রার্থী বাছাইয়ে প্রাধান্য পাচ্ছে।
মানিকগঞ্জ–১ (ঘিওর, দৌলতপুর ও শিবালয় উপজেলা)
মানিকগঞ্জের অন্য দুই আসনের তুলনায় বরাবরই এখানে রাজনৈতিক উত্তেজনা বেশি। এবারের নির্বাচনেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মনোনয়নের দ্বিতীয় ধাপে বিএনপি এই আসনে প্রার্থী হিসেবে জেলার সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আহ্বায়ক কমিটির সদস্য এস এ জিন্নাহ কবিরের নাম ঘোষণা করে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন অন্য দুই মনোনয়নপ্রত্যাশীর কর্মী-সমর্থকরা।
বিএনপির মরহুম মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের বড় ছেলে ড. খোন্দকার আকবর হোসেন বাবলুর সমর্থকরা মনোনয়ন না পাওয়ায় ঢাকা–আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। মনোনয়ন পুনর্বিবেচনার দাবিতে তারা জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনও করেন। অন্যদিকে দৌলতপুর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান তোজাম্মেল হক দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাকে ইতোমধ্যে কৃষকদলের সভাপতির পদ থেকেও বহিষ্কার করা হয়।
এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে অনেক আগেই ঘোষণা দেওয়া হয়েছে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের নেতা ডা. আবু বকর সিদ্দিকের নাম। দলে প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় তিনি স্বস্তিতে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তবে ভোটারদের মতে, তুলনামূলক কম পরিচিতির কারণে বিএনপির প্রার্থী বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন।
এছাড়া এনসিপি থেকে ওমর ফারুক ও আবু আব্দুল্লাহ, গণঅধিকার পরিষদ থেকে ইলিয়াস হোসাইন, খেলাফত মজলিস থেকে মুফতি আশরাফুল আলম এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে খোরশেদ আলম নির্বাচনি মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।
মানিকগঞ্জ–২ (সিঙ্গাইর, হরিরামপুর ও সদর উপজেলার অংশবিশেষ)
বিএনপির একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী থাকলেও প্রথম ধাপেই সাবেক সংসদ সদস্য ও দলটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইঞ্জিনিয়ার মইনুল ইসলাম খান শান্তকে চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। মনোনয়ন ঘিরে বড় ধরনের বিরোধ না থাকায় তিনি মাঠে বেশ সক্রিয়।
তবে ইসলামিক দলগুলোর একাধিক শক্ত প্রার্থী থাকায় ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জামায়াতে ইসলামী থেকে জাহিদুর রহমান এবং খেলাফত মজলিস থেকে শেখ মো. সালাহ উদ্দিন প্রচারণা চালাচ্ছেন। দুজনেরই কেন্দ্রীয় পজিশন ভালো থাকায় সমঝোতা না হলে ইসলামিক ঘরানার ভোট ভাগ হতে পারে বলে মনে করছেন সিঙ্গাইর ও হরিরামপুরের ভোটাররা।
এছাড়াও এ আসন থেকে জেলা এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক নওয়াব আলী মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। এদের পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মোহাম্মদ আলী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের সিঙ্গাইর উপজেলা সভাপতি দ্বীন মুহাম্মদ, সিপিবির জেলা সভাপতি অধ্যাপক আবুল ইসলাম শিকদারও এই আসনে নির্বাচনের জন্য প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
মানিকগঞ্জ–৩ (সদর ও সাটুরিয়া উপজেলা)
জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে ধানের শীষের মনোনয়ন চেয়েছিলেন একাধিক প্রার্থী। বিএনপি শেষ পর্যন্ত চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আফরোজা খানম রিতার ওপর আস্থা রাখে। তার নাম ঘোষণার পর জেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা একযোগে মাঠে নামেন।
মুন্নু ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পসহ বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে রিতা ইতোমধ্যে ভোটারদের মধ্যে সাড়া ফেলেছেন। নারী ভোটার বেশি হওয়াও তার জন্য বাড়তি সুবিধা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতা এখনো মনোনয়ন পুনর্বিবেচনার আশায় প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
আসনটির গুরুত্ব বিবেচনায় জামায়াত দলের ঢাকা মহানগর উত্তরের সহকারী পরিচালক হিসেবে মাওলানা দেলওয়ার হোসাইনকে প্রার্থী করেছে। তিনি নিয়মিত প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া বাংলাদেশ জাসদের শাহজাহান আলী (সাজু মল্লিক), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা শামসুদ্দিন আহমেদ, খেলাফত মজলিসের তাওহিদুল ইসলাম তুহিন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুফতি শাহ সাঈদ নূর, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির জেলার রফিকুল ইসলাম এই আসনে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া এনসিপির পক্ষে মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন তিনজনÑএনসিপি মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক জাহিদুর রহমান তালুকদার এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নাহিদ মনির ও ওমর ফারুক। তারাও এলাকায় সমানতালে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

