আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বিচার পাননি যশোরে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার নারী

আহসান কবীর, যশোর ও রোকনুজ্জামান রিপন, বেনাপোল

বিচার পাননি যশোরে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার নারী

কুমিল্লার মুরাদনগরে দলবদ্ধ ধর্ষণ নিয়ে দেশজুড়ে যে হইচই হয়েছে, তার ছিটেফোঁটাও হয়নি আওয়ামী জমানায় যশোরের শার্শার আরেক ঘটনায়। ২০১৬ সালের জুন মাসে ইউপি নির্বাচনে ‘ধানের শীষে’ ভোট দেওয়ায় এক নারী নারকীয় নির্যাতনের শিকার হন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিজ্ঞাপন

ভুক্তভোগীর পরিবারের দাবি, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী পান্ডাদের দৌরাত্ম্যে তারা মামলা পর্যন্ত করতে পারেননি। ওই নারীর ডাক্তারি পরীক্ষা হলেও রিপোর্টটি পর্যন্ত তারা হাতে পাননি। উপরন্তু আওয়ামী শাসনের পরবর্তী ৮ বছরে তাদের ‘দৌড়ের ওপর’ থাকতে হয়েছে।

সম্প্রতি ওই নারীর বাড়িতে গিয়ে কথা বলেন আমার দেশ প্রতিবেদক। পরিবারটি তাদের অসহায়ত্বের কথা জানান; সে সঙ্গে দোষীদের বিচার দাবি করেন।

২০১৬ সালের ৪ জুন যশোরের শার্শা উপজেলার গোগা ইউপি নির্বাচনে বিএনপিদলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী ছিলেন মো. সরোয়ার হোসেন। ভুক্তভোগী পরিবারটি বিএনপি প্রার্থীর ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে ভোট দিয়েছিল। বুথের মধ্যে থাকা আওয়ামী সন্ত্রাসীরা ওই নারীর হাত থেকে ব্যালট পেপার কেড়ে নিয়ে দেখে, সেখানে ধানের শীষ প্রতীকে সিল মারা। বুথের মধ্যেই তারা ওই নারীকে হুমকি দেয়। যদিও বুথের মধ্যে শুধু ভোট দিতে যাওয়া ব্যক্তিরই প্রবেশাধিকার থাকার কথা।

ওই নারী বলেন, ‘আমরা বিএনপি করি। তাই ধানের শীষে ভোট দিয়েলাম (দিয়েছিলাম)। আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী শামসুজ্জামান বুলু মেম্বারের লোক শাহিন ডাক্তার, নজু মাস্টারসহ কয়েকজন আমার হাততে (হাত থেকে) ব্যালট কেড়ে নিয়ে গালিগালাজ করে। এরা সব নৌকার প্রার্থীর গুন্ডা।’

ওই রাতসহ পরের দিনগুলো ছিল পরিবারটির জন্য বিভীষিকাময়। তাদের বাড়িটি বেশ ফাঁকা জায়গায়। খানিকটা দূরে একটি বাড়ি। গ্রামের অন্যদের বাড়িঘর আরো দূরে। ভুক্তভোগী নারীর বয়স তখন ৩৩-৩৪ বছর। বাল্যবিয়ে দেওয়া তাদের মেয়েটি তখন শ্বশুরবাড়িতে, আর একমাত্র ছেলে হেফজখানায়।

পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ছেড়ে আত্মীয়দের কাছে গিয়ে আশ্রয় নেন স্বামী-স্ত্রী। কিন্তু ভাঙাচোরা হলেও নিজের বাড়ি তো! পরদিনই তারা বাড়িতে ফিরে আসেন। এর পরের ঘটনা গা শিউরে ওঠার মতো।

স্থানীয়রা বলছেন, সন্ধ্যার পর আওয়ামী লীগের ২০-২৫ সন্ত্রাসী এসে বাড়িটি ভাঙচুর করে। তখন স্বামী-স্ত্রী দৌড়ে পালিয়ে আশ্রয় নেন পাশের পাটক্ষেতে। লোকজন চলে গেলে তারা ঘরে ফেরেন।

ওই নারীর কথায়, ‘রাত ১২টার পর সেকেন্দার, সবুজ, জাহাঙ্গীরসহ ৫-৬ সন্ত্রাসী আবার আমাদের বাড়িতে হামলা করে। আমরা দোইড়ে (দৌড়ে) আবার পাটক্ষেতে ঢুকে পড়ি। ধাওয়া কত্তি (করতে) থাকা সন্ত্রাসীরা আমাদের দুজনকেই ধরে ফেলে। আমার স্বামী মার খাইয়ে (খেয়ে) পলায়ে (পালিয়ে) যায়। শাড়ি পরা ছিলাম, তাইতি (সেই জন্য) ওরা আমারে (আমাকে) ধরে ফেলে কুষ্টাবনে (পাটক্ষেতে) শুইয়ে ফেলে। এর পরের কথা আর কী কবো (বলবো)।’

ওই নারীর স্বামী বলেন, সন্ত্রাসীদের মার খেয়ে ছুটে পালিয়ে তিনি সোজা চলে যান বড় গ্রামটির আরেক প্রান্তে শ্বশুরবাড়িতে। সেখান থেকে লোকজন জোগাড় করে আনতে কেটে যায় ৪০-৪৫ মিনিট। লোকজন এগিয়ে এলে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। এর আগে তার স্ত্রী পাটক্ষেত থেকে চিৎকার করলেও ভয়ে কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেনি।

যে পাটক্ষেতে ওই লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে, সেটি ছাড়ালেই আবু বক্কারের বাড়ি। তিনি আমার দেশকে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘আমরা চিৎকার-চেঁচামেচি শুনেছি। কিন্তু আওয়ামী লীগের গুন্ডাদের ভয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ওই গৃহবধূকে রক্ষা করতে পারিনি।’

অভিযুক্তদের মধ্যে জাহাঙ্গীর মারা গেছে বছর তিনেক আগে। বুলু মেম্বারসহ অন্যরা আওয়ামী লীগের পতনের পর গা-ঢাকা দিয়েছে।

গৃহবধূর স্বামী জানান, রাতের ঘটনার পর সকালেই তিনি স্ত্রীকে নিয়ে যশোর জেনারেল হাসপাতালে যান। সেখানে স্ত্রীর ডাক্তারি পরীক্ষা হয়েছিল জানিয়ে বলেন, কিন্তু শার্শা আর যশোরের সন্ত্রাসীদের দাপটে চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রেখেই হাসপাতাল থেকে নিরুদ্দেশ হতে হয়।

নির্যাতিতা নারী বলেন, একজন নারী চিকিৎসক তার ডাক্তারি পরীক্ষা করেছিলেন। কিন্তু পরীক্ষার রিপোর্ট হাসপাতাল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এরপর শুরু হয় রশিদ চেয়ারম্যান, বুলু মেম্বার আর পুলিশের অত্যাচার। রশিদ-বুলু গং পরিবারটিকে শার্শায় নিয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের মুখোমুখী করে। তাদের বাধ্য করা হয় শিখিয়ে দেওয়া কথা বলতে।

পরিবারটির ভাষ্য, অন্তত তিন দফা তাদের ডেকে নেওয়া হয়েছে শার্শা থানায়। সেখানে ডেকে নেওয়া পুলিশ কর্মকর্তা প্রতিবারই তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন। শাসিয়েছেন, ঘটনার ব্যাপারে আদালতে যাতে কোনো মামলা না করা হয়। আটক করে নাশকতা মামলায় অজ্ঞাত আসামিদের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়। ফলে গৃহবধূর স্বামী বহুদিন নিজ বাড়িতে ঘুমাতেও পারেননি।

তখন কোন ওসি বা পুলিশ অফিসার এই কাজে যুক্ত ছিলেন, তাদের নাম বলতে পারেনি পরিবারটি। গণমাধ্যম ঘেঁটে দেখা গেছে, তখন শার্শা থানায় ওসি হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন মনিরুজ্জামান। ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তা এখনো চাকরিতে আছেন বা থাকলেও কোথায় আছেনÑসে সন্ধান পাওয়া যায়নি।

যে চেয়ারম্যান প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার অপরাধে আওয়ামী দুর্বৃত্তরা নারকীয় ঘটনা ঘটায়, সেই সরোয়ার হোসেন বলেন, ‘ওই গৃহবধূর ওপর যে ভয়াবহ নির্যাতন হয়েছিল, তা আশপাশের সবাই জানে। কিন্তু তারা সে সময়ের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ দুর্বৃত্তদের দাপটে মামলা করতে পারেননি।’

লোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটার কদিন পর যশোর থেকে বিএনপির বেশ কজন নেতা ওই বাড়িটিতে গিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন বর্তমানে দলের কেন্দ্রীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু, সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন প্রমুখ।

অ্যাডভোকেট সাবু বলেন, ‘আমরা যখন নির্যাতিতার বাড়িতে যাই, তখনও সেখানে আওয়ামী দুর্বৃত্তদের রামরাজত্ব; অত্যন্ত ভীতিকর পরিবেশ ছিল। ভাঙচুর করা ঘরবাড়ি মেরামত করতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে পরিবারটিকে কিছু আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসি।’

এখন নির্যাতিত পরিবারটি আইনগত ও অন্যান্য সহায়তা চায়। সেক্ষেত্রে বিএনপির কিছু করণীয় আছে কি নাÑআমার দেশ-এর এমন প্রশ্নে দলনেতা অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘আমাদের আইনি সহায়তা সেল সব সময়ই আইনগত সহায়তা দিতে প্রস্তুত। আর বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে ভবিষ্যতে সরকারের পক্ষ থেকে পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো হবে।’

আমার দেশ-এর এক প্রশ্নের জবাবে যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হোসাইন সাখাওয়াৎ বলেন, তখন যদি ডাক্তারি পরীক্ষা হয়ে থাকে, তাহলে আদালতের নির্দেশনা পেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবশ্যই পুরোনো রিপোর্ট বের করে দিতে বাধ্য।

যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও জেলা পুলিশের মুখপাত্র নূর-ই আলম সিদ্দিকী আমার দেশকে বলেন, ফৌজদারি অপরাধ কখনো তামাদি হয় না। ইচ্ছা করলে নির্যাতিত নারী এখনো পুলিশ ও আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন। তবে যেহেতু অভিযোগটি অনেক পুরোনো, তাই প্রমাণ করা কঠিন হতে পারে। আর ওই সময় কোনো পুলিশ কর্মকর্তা যদি নির্যাতিতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে থাকেন, তা তথ্য-প্রমাণ আকারে হাজির করতে পারলে নিশ্চয়ই পুলিশ প্রশাসন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন