ব্যাংক খাত থেকে একজন গ্রাহকের অঢেল ঋণ নেওয়ার সুযোগ সীমিত করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পুরো ব্যাংক খাত মিলিয়ে একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ কত টাকা ঋণ নিতে পারবেন, সেই সীমা নির্ধারণ করে দিতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে বড় ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকের পরিবর্তে পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনাও করছে সংস্থাটি। মূলত ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, ঋণের ঝুঁকি কমানো এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখতেই এসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন থেকেও এ ধরনের প্রস্তাব পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়া শুরু হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে শিগগির এ-সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, গত এক দশকে ঋণ জালিয়াতি, দুর্বল তদারকি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সুশাসনের অভাবে ব্যাংক খাত দুর্বল হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী একাধিক প্রতিষ্ঠান, আত্মীয়-স্বজন কিংবা সহযোগীদের নামে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বিপুল অর্থ বের করে নিয়েছে। এসব ঋণ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। ঋণের অর্থ আদায় না হওয়ায় খেলাপিতে ডুবছে ব্যাংক খাত। এমন পরিস্থিতির কারণে ঋণসীমা নির্দিষ্ট করে দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে একজন গ্রাহক একটি ব্যাংক থেকে ওই ব্যাংকের মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ নিতে পারেন। তবে পুরো ব্যাংক খাত থেকে একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ কত ঋণ নিতে পারবেন—সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনা নেই। তাই পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা বিবেচনায় ঋণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হবে। এতে একজন গ্রাহকের কাছে অতিরিক্ত ঋণ কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি কমবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংকগুলোর বর্তমান তারল্য চাপে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বড় ভূমিকা রয়েছে। কারণ, ব্যাংকগুলো মূলত স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি আমানত সংগ্রহ করে। কিন্তু সেই অর্থ দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে বিনিয়োগ করে। এতে ব্যাংকের সম্পদ ও দায়ের (অ্যাসেট-লায়াবিলিটি) মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়, যা তারল্য ঝুঁকি বাড়ায়। এ কারণে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য বিকল্প উৎস হিসেবে বন্ড মার্কেট ও পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি বন্ড মার্কেটের মাধ্যমে অর্থায়ন করতে পারে, তাহলে ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আরো বেশি ঋণ দিতে পারবে। এতে অর্থনীতিতে ঋণের আরো কার্যকর বণ্টন নিশ্চিত হবে। তবে শুধু নীতিমালা করলেই হবে না, বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাংকের বাইরে অর্থায়নে নিতে হলে আগে শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও কার্যকর বন্ড মার্কেট এবং পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে হবে।
জানা গেছে, ব্যাংক খাতে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং ঋণ আদায় বাড়াতে তিন ধাপের কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরিকল্পনাটি স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি—এই তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এতে ব্যাংকগুলোর জন্য খেলাপি ঋণ কমানোর বার্ষিক লক্ষ্য নির্ধারণ থেকে শুরু করে একজন গ্রাহকের সর্বোচ্চ ঋণ গ্রহণে সীমা নির্ধারণ, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) গঠন এবং বড় অর্থায়নে ব্যাংকের পরিবর্তে বন্ডের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ রাখা হয়েছে।
স্বল্পমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা
খেলাপি কমাতে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার মেয়াদ ধরা হয়েছে এক বছর। এ পরিকল্পনায় বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিটি ব্যাংকের জন্য শ্রেণিকৃত ঋণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করবে। একইসঙ্গে ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী হালনাগাদ, বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে—এমন ব্যাংকে প্রম্পট কারেকটিভ অ্যাকশন (পিসিএ) বাস্তবায়ন, প্রধান নির্বাহীদের নিয়োগ ও পুনঃনিয়োগে খেলাপি ঋণের বিষয়টি বিবেচনা এবং শীর্ষ ২০ খেলাপি ঋণ আদায়ের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার ক্ষেত্রে দুবছরের সময়সীমা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ পরিকল্পনায় ঋণ ঝুঁকি প্রশমনে ব্যাংকগুলোকে আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম (ইডব্লিউএস) চালু করতে হবে, যার মাধ্যমে গ্রহীতা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলেও সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি কমানো বা এড়ানো যায়। এছাড়া আইএফআরএস-৯ বাস্তবায়ন, জামানতের স্বাধীন মূল্যায়ন ব্যবস্থা, ঋণ আদায়ে কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারীদের উৎসাহিত করতে প্রণোদনা, খেলাপি ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশ, লোন টু ইকুইটি কনভার্সন (যার মাধ্যমে কোনো কোম্পানি তার বকেয়া ঋণকে মালিকানা বা ইকুইটি শেয়ারে রূপান্তরিত করে) এবং লোন টেকওভার-সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা
আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে দীর্ঘমেয়াদি যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তার মেয়াদ পাঁচ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনায় পুরো ব্যাংক খাত থেকে একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ কত টাকা ঋণ নিতে পারবেন, সেই সীমা নির্ধারণ করা হবে। বর্তমানে একটি ব্যাংক থেকে একজন গ্রাহক কি পরিমাণ ঋণ নিতে পারবেন, তার সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। তবে পুরো ব্যাংক খাত থেকে কত নিতে পারবেন, সেই সীমা নেই। পাশাপাশি ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা আরো কঠোর করা, অর্থঋণ আদালতের বিচারক প্যানেলে অভিজ্ঞ ব্যাংকার অন্তর্ভুক্ত করা, খেলাপি গ্রাহক যেন রিট করে ঋণ আদায় কার্যক্রম স্থবির করতে না পারে—সে ব্যবস্থা, বেসরকারি খাতে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) গঠনের জন্য আইন প্রণয়ন এবং এক হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের পরিবর্তে বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের নির্দেশনা দেওয়া হবে। এছাড়া ব্যাংক কোম্পানি আইনসহ সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের উদ্যোগও রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ব্যাংক খাতে সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ঋণ আদায় ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে। বিশেষ করে বড় ঋণ বিতরণে নতুন নীতিমালা ব্যাংক খাতের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, একজন গ্রাহক কত ঋণ নিতে পারবেন, তার একটি যৌক্তিক সীমা নির্ধারণ করা সময়োপযোগী উদ্যোগ। বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান সামান্য নিজস্ব মূলধন নিয়ে ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিচ্ছে, যা ব্যাংক খাতের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। সেক্টরভিত্তিক ঋণসীমা নির্ধারণ এবং বড় অর্থায়নের জন্য ক্যাপিটাল মার্কেট ও বন্ড মার্কেটকে বেশি ব্যবহার করা হলে কোম্পানিগুলো নিজস্ব মূলধন বাড়াতে উৎসাহিত হবে এবং অর্থায়নের উৎসও বহুমুখী হবে।
তিনি বলেন, তবে এ ধরনের নীতি একবারে কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা উচিত। কারণ, বর্তমানে ব্যাংক খাতে অনেক ‘ফোর্সড লোন’ রয়েছে, যা বাস্তব কারণে দ্রুত সমন্বয় করা সম্ভব নয়। একইসঙ্গে ব্যাংক ঋণের উপর নির্ভরতা কমাতে হলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিকল্প অর্থায়নের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তাদের বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত না হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, সারা বিশ্বেই শিল্পায়ন ও ব্যবসা সম্প্রসারণে মানি মার্কেট এবং ক্যাপিটাল মার্কেটের ভূমিকা আলাদা। সাধারণত মূলধনী যন্ত্রপাতিসহ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অর্থায়ন হয় ক্যাপিটাল মার্কেট থেকে। অন্যদিকে কার্যকরী মূলধনের চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হয় ব্যাংক ঋণ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


