চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) রপ্তানি আয় সামান্য কমেছে। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত পোশাক রপ্তানি হয়েছে এক হাজার ৯৩৩ কোটি ৫৭ লাখ ডলারের, যা গত বছরের একই সময়ের এক হাজার ৯৪৫ কোটি ৯৩ লাখ ডলারের তুলনায় শূন্য দশমিক ৬৩ শতাংশ কম। এর মধ্যে ওভেন পোশাক রপ্তানি কিছুটা বাড়লেও নিট পণ্যে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির কারণে সামগ্রিক রপ্তানি কমেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ওভেন পোশাক থেকে রপ্তানি আয় এসেছে ৯১৯ কোটি ৯৫ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ৯১৩ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। ফলে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে শূন্য দশমিক ৬৮ শতাংশ।
অন্যদিকে, নিট পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে এক দশমিক ৮০ শতাংশ। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন সময়ে নিট পণ্য রপ্তানি হয়েছে এক হাজার ১৩ কোটি ৫৮ লাখ ডলারের। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ আয় ছিল এক হাজার ৩২ কোটি ১৭ লাখ ডলার।
মাসভিত্তিক হিসাবে বছরের শুরুতেই পোশাক রপ্তানিতে ধাক্কা দেখা যায়। জানুয়ারিতে মোট আরএমজি রপ্তানি হয়েছে ৩৬১ কোটি ৪৮ লাখ ডলারের, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় এক দশমিক ৩৫ শতাংশ কম। ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি কমেছে ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ এবং মার্চে ১৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। এ সময় ওভেন ও নিট–দুই ধরনের পোশাকেই রপ্তানি কমেছে।
তবে এপ্রিল মাসে ঘুরে দাঁড়ায় খাতটি। ওই মাসে মোট পোশাক রপ্তানি ৩১ দশমিক ২১ শতাংশ বেড়ে ৩১৪ কোটি ৯ লাখ ডলারে উন্নীত হয়। ওভেন রপ্তানি ৩২ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং নিট পোশাক ৩০ দশমিক ২ শতাংশ বাড়ে।
এর পরের মাস মে-তে আবার রপ্তানি কমে যায়। এ মাসে মোট আয় হয়েছে ৩৫৯ কোটি ৪১ লাখ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় আট দশমিক ২৯ শতাংশ কম। জুনে অবশ্য প্রবৃদ্ধির ধারায় ফেরে পোশাক রপ্তানি। শেষ মাসে ৩৩৮ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা এক বছরের ব্যবধানে ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ বেশি। জুনে ওভেন পোশাকে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৪ দশমিক ২ শতাংশ, আর নিটে ১৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমার দেশকে বলেন, চলতি বছরের প্রথমার্ধে তৈরি পোশাক রপ্তানির সামগ্রিক চিত্রে কিছুটা স্বস্তি রয়েছে। তবে প্রথম ছয় মাসের এই প্রবৃদ্ধি বছর শেষে থাকবে কি না সন্দেহ আছে।
তিনি বলেন, বিএনপির আগের আমলে ২০০৫ ও ২০০৬ সালের দিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য তখন বিকেএমইএর সদস্য সংখ্যা ছিল আড়াই হাজার। এরপর দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনে দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ায় শিল্প মালিকদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়, বর্তমানে বিকেএমইএর সদস্য সংখ্যা ৮০০-তে নেমে এসেছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বছরের শুরুতে রপ্তানি কমলেও জুনে এসে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। একই সঙ্গে ওভেন পোশাকে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা বাংলাদেশের সক্ষমতার একটি ইতিবাচক দিক। মাত্র শূন্য দশমিক ৬৩ শতাংশ রপ্তানি কমা থেকে বোঝা যায়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নানা অনিশ্চয়তা ও বাজার সংকটের মধ্যেও দেশের পোশাক খাত মোটামুটি স্থিতিশীল অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ, উৎপাদন সক্ষমতা এবং পরিবেশবান্ধব কারখানার কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতাও এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
তাদের মতে, সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক। বিশ্ব অর্থনীতির মন্থর গতি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে চাহিদার দুর্বলতা, বাড়তি উৎপাদন ব্যয় ও জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি ক্রেতাদের কাছ থেকে কম দামে পণ্য সরবরাহের চাপ–রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে বাধা তৈরি করতে পারে। এর সঙ্গে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর শুল্ক সুবিধা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকে নতুন প্রতিযোগিতার মুখে ফেলবে। এ পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে প্রচলিত পণ্যনির্ভর ব্যবসা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি উচ্চমূল্যের পোশাক, বৈচিত্র্যময় পণ্য এবং নতুন বাজার তৈরিতে জোর দিতে হবে। এতে একদিকে উৎপাদন দক্ষতা বাড়বে, অন্যদিকে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও আরো শক্তিশালী হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


