প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে কৃষকদের আস্থা ও ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেছেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মফিজ উদ্দিন। তার একটি হাত নেই। জীবনের নির্মম এক দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন ডান হাত। কিন্তু হারাননি মনোবল, দায়িত্ববোধ, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার বরং সেই দুর্ঘটনাই যেন তাকে আরো দৃঢ় করে তুলেছে। মাঠে মাঠে কৃষিসেবা পৌঁছে দিয়ে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। কৃষকের সমস্যাই যেন তার নিজের সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। কোনো কৃষকের জমিতে রোগ দেখা দিলে, ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে কিংবা নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে জানার প্রয়োজন হলে সবার আগে তিনি ছুটে যান।
হলিধানী ব্লকে বর্তমানে প্রায় চার হাজার ৫৫৩ জন কৃষক রয়েছেন। ধান, গম, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি ও মসলা জাতীয় ফসল চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন তারা। এসব কৃষকের জন্য সরকারি কৃষিসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্বে রয়েছেন তিনি। কিন্তু দায়িত্ব তার কাছে শুধু সরকারি চাকরির অংশ নয়, এটি যেন এক ধরনের মানবিক অঙ্গীকার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কালীচরণপুর ইউনিয়নের ছোট মান্দারবাড়িয়া গ্রামের সন্তান মফিজ উদ্দিন। বাবা মৃত আফসার উদ্দিন জোয়ার্দার। সাত ভাই ও দুই বোনের বড় পরিবারে বেড়ে ওঠা মফিজ ছোটবেলা থেকেই সংগ্রামের সঙ্গে পরিচিত। বর্তমানে তিনি দুই মেয়ের বাবা। শিক্ষাজীবনে ঝিনাইদহ থেকে এসএসসি (ভোকেশনাল) পাস করার পর ফরিদপুর কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ইন এগ্রিকালচার সম্পন্ন করেন। পরে যশোরে কাজী নজরুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজ থেকে ব্যাচেলর অব এডুকেশন (এগ্রিকালচার) ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০৯ সালের ১১ জানুয়ারি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত অবস্থায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ট্রাকের চাপায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তার একটি হাত। মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় পুরো জীবন। হাসপাতালে শুয়ে থাকা সেই দিনগুলোতে ভবিষ্যৎ যেন অন্ধকারে ঢেকে গিয়েছিল। পরিবার, স্বপ্ন, কর্মজীবন-সবকিছু নিয়ে তৈরি হয়েছিল অনিশ্চয়তা। অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন না কিন্তু তিনি হার মানেননি।
কৃষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ধানের জমিতে রোগ দেখা দিলে আগে খুব চিন্তায় পড়ে যেতাম। এখন মফিজ ভাইকে ফোন দিলেই চলে আসেন। জমিতে নেমে রোগ শনাক্ত করেন, কী ওষুধ দিতে হবে বলে দেন। এক হাত না থাকলেও কাজের ক্ষেত্রে তাকে কখনো দুর্বল মনে হয়নি। কৃষক আলামীন বলেন, অনেক কর্মকর্তা অফিসে বসে দায়িত্ব পালন করেন।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুর-এ-নবী বলেন, মফিজ উদ্দিন অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও পরিশ্রমী কর্মকর্তা। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার কাজে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। তিনি সাহস, সংগ্রাম, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীক।
এএস
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

