ধ্বংসস্তূপ থেকে আবারো ঘুরে দাঁড়াচ্ছে গাজার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়

ধ্বংসস্তূপ থেকে আবারো ঘুরে দাঁড়াচ্ছে গাজার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়

ইসরাইলের দীর্ঘস্থায়ী সামরিক হামলা ও অবরোধে বিধ্বস্ত গাজার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেও শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রাখার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। ক্যাম্পাস, গবেষণাগার ও গ্রন্থাগারের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরো শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা বিকল্প উপায়ে পাঠদান চালিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানী তৈরির চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।

বিজ্ঞাপন

যুদ্ধের আগে গাজার অন্যতম শীর্ষ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়। বিশেষ করে চিকিৎসাবিজ্ঞান, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও প্রকৌশলের মতো ব্যবহারিক শিক্ষানির্ভর বিষয়ে আধুনিক ল্যাবরেটরি ও প্রশিক্ষণ সুবিধার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তোলা হতো। তবে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলায় সেই শিক্ষাব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি সমন্বয়কারী ইয়াসিন আল-নৌনু জানান, যুদ্ধ শুরুর মাত্র কয়েকদিন আগে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের জন্য নতুন অ্যানাটমি মডেল, প্রশিক্ষণের জন্য কঙ্কালসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছেছিল। কিন্তু ব্যাপক বোমাবর্ষণে অবকাঠামো, গবেষণাগার ও মূল্যবান যন্ত্রপাতির বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় সেগুলো আর ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।

গাজা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক আব্দুল রউফ আল-মানামা।
গাজা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক আব্দুল রউফ আল-মানামা।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধে ১৯টি শিক্ষা ভবন ধ্বংস হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৫০০টি শ্রেণিকক্ষ, ২০০টি বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার এবং ৭৫টি কম্পিউটার ল্যাব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার হারিয়েছে দুই লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি বই, গবেষণা নিবন্ধ, রেফারেন্স ও একাডেমিক থিসিস।

স্বাস্থ্যবিজ্ঞান অনুষদের ডিন আবদুল রউফ আলী আল-মানামা বলেন, গত তিন বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সময়গুলোর একটি। শুধু ভবন নয়, কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি, গবেষণাসামগ্রী ও শিক্ষাসংক্রান্ত সম্পদও ধ্বংস হয়ে গেছে। বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবেও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ভবন ব্যবহৃত হওয়ায় শিক্ষা কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

ফিলিস্তিনি শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউনেস্কোর যৌথ মূল্যায়নে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের পর থেকে গাজার অধিকাংশ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুরুতর ক্ষতির মুখে পড়েছে। শত শত বিশেষায়িত গবেষণাগার অচল হয়ে যাওয়ায় ব্যবহারিক প্রশিক্ষণনির্ভর অনেক কোর্স এখন কেবল তাত্ত্বিকভাবে পড়ানো হচ্ছে।

গাজা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি বিভাগের প্রধান ইয়াসিন আল-নৌনু
গাজা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি বিভাগের প্রধান ইয়াসিন আল-নৌনু

পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন শিক্ষা, ভার্চুয়াল সিমুলেশন, ধারণকৃত ল্যাব পরীক্ষার ভিডিও এবং হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রভিত্তিক প্রশিক্ষণের ওপর নির্ভর করছে। তবে ডিন আল-মানামার মতে, এগুলো কেবল সাময়িক সমাধান; বাস্তব গবেষণাগারের বিকল্প হতে পারে না।

চিকিৎসা শিক্ষার্থী দিমা মুহাইসেন বলেন, যুদ্ধের আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ল্যাবরেটরিতে কাজ করে চিকিৎসক হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ ছিল। কিন্তু মেডিসিন অনুষদ ধ্বংস হওয়ার পর তার শিক্ষাজীবনের বড় অংশ এখন হাসপাতালের করিডোর, রোগীর কক্ষের পাশ কিংবা জরুরি বিভাগেই কাটছে।

তিনি বলেন, অনেক সময় হাসপাতালের কোণায় কিংবা রোগীর কক্ষের মাঝেই চিকিৎসকদের ঘিরে ক্লাস করতে হয়েছে। সেখানে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম পরিবেশও ছিল না।

যুদ্ধকালীন দুই বছর তিনি গাজার বিভিন্ন হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, ক্ষত পরিচর্যা ইউনিট ও সার্জারি বিভাগে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছেন। প্রথমে সাধারণ দায়িত্ব পালন করলেও পরে অপারেশন থিয়েটারে সহায়তা করা, অস্ত্রোপচারের পর রোগীদের পর্যবেক্ষণ এবং তাদের প্রয়োজনীয় সেবায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান। তার ভাষায়, এই অভিজ্ঞতা চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ববোধ আরও গভীর করেছে।

বর্তমানে প্রধান ক্যাম্পাস ব্যবহার অনুপযোগী হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় গাজার বিভিন্ন এলাকায় পাঁচটি অস্থায়ী শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপন করেছে। একই সঙ্গে পাঠ্যক্রম পুনর্বিন্যাস, অনলাইন ক্লাস এবং হাসপাতাল ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানে মাঠপর্যায়ের প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, পূর্ণাঙ্গভাবে শিক্ষা কার্যক্রম পুনরুদ্ধারের জন্য নতুন গবেষণাগার, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, মাইক্রোস্কোপ, বিশ্লেষণ যন্ত্র, জীবাণুমুক্তকরণ ব্যবস্থা, রাসায়নিক উপকরণ এবং বিশেষায়িত কম্পিউটার প্রয়োজন। কিন্তু গাজায় ইসরাইলের অবরোধের কারণে এসব সরঞ্জাম, নির্মাণসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানি করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের লক্ষ্য থেকে সরে আসেনি। তাদের বিশ্বাস, গাজার পুনর্গঠনে ভবিষ্যতের চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও দক্ষ পেশাজীবীরাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। তাই শিক্ষাব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা মানেই কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, পুরো সমাজের ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা।

চিকিৎসা শিক্ষার্থী দিমা মুহাইসেনের ভাষায়, আজ শিক্ষায় বিনিয়োগ মানেই পুনরুদ্ধারে বিনিয়োগ। কারণ মানুষকে গড়ে তোলা, ধ্বংস হওয়া ভবন পুনর্নির্মাণের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: আল জাজিরা

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন