ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশন দিনের আলোয় কোলাহলমুখর থাকলেও সন্ধ্যা নামলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন যাত্রীরা। রাত নামলেই বদলে যায় এই রেলওয়ে স্টেশনের পুরো চিত্র, নেমে আসে নীরবতা, অন্ধকার আর ভয়। এর কারণ হচ্ছে, মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশনে রেল পুলিশের কোনো নিরাপত্তা ক্যাম্প নেই, নেই পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা। এমনকি যাত্রীদের নিরাপদে এক প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্য প্ল্যাটফর্মে যাওয়ার জন্য ফুটওভার ব্রিজও নেই। ফলে রাতে ট্রেনের যাত্রীরা বরাবরই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে থাকেন। অভিযোগ আছে, সুযোগ বুঝে ছিনতাইকারীদের অপতৎপরতা বাড়ার পাশাপাশি নারী যাত্রীরা ইভটিজিং ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। গভীর রাতে প্ল্যাটফর্মে মাদকসেবীদের আড্ডা বসার অভিযোগও রয়েছে। এলাকাবাসী ও যাত্রীদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ এই রেলস্টেশনে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি থাকলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বিশেষ করে রাতের বেলায় রেলস্টেশনে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য না থাকায় যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়।
কালীগঞ্জের মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশনের অন্যতম সমস্যা হলো ফুটওভার ব্রিজ না থাকা। ১ নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মে যেতে যাত্রীদের সরাসরি রেললাইন পার হতে হয়। ট্রেন আসা-যাওয়ার সময় এবং অনেককে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রেললাইন পার হতে দেখা যায়। বিশেষ করে শিশু নারী ও বয়স্ক যাত্রীদের পড়তে হয় বিড়ম্বনায়। এভাবে ঝুঁকি নিয়ে পারাপারের কারণে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনায় পড়ার আশঙ্কা থাকে। যাত্রীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে দ্রুত ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিন ধরে জানানো হলেও তা আমলে নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এছাড়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম উঁচু-নিচু থাকার কারণে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। গত ২৬ সেপ্টেম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ট্রেনে উঠতে গিয়ে রাবেয়া খাতুন নামের এক যাত্রী দুই পা বিচ্ছিন্ন হয়ে মারা যান। ঢাকা থেকে খুলনাগামী চিত্রা এক্সপ্রেসের যাত্রী আরিফ হোসেন ও মুশফিকুর রহমান বলেন, মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশনে রাতের বেলা নিরাপত্তার খুব ঘাটতি রয়েছে। রাতে প্রশাসনের লোকজন তেমন দেখা যায় না। রেলস্টেশনের প্রধান সড়ক প্ল্যাটফর্ম ও আশপাশ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে থাকে।
প্ল্যাটফর্মের শেষ মাথা থেকে বাবরা রেলগেট পর্যন্ত এলাকার দুপাশে কোনো নিরাপত্তাবেষ্টনী না থাকায় অনেক চুরি-ছিনতায়ের মতো ঘটনা ঘটে থাকে। এছাড়া রাতের বেলায় রেললাইনের ল্যাম্পপোস্টগুলোতে বাতি জ্বলার কথা থাকলেও তা জ্বলে না। গভীর রাতে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বসে মাদকসেবীদের আড্ডা। অন্ধকার ও নিরাপত্তাকর্মীর স্বল্পতার সুযোগে মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। এতে সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক আরো বাড়ে। এলাকাবাসীর দাবি, মাদকের আড্ডা বন্ধ এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্টেশনে সার্বক্ষণিক পুলিশি নজরদারি প্রয়োজন। মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশনে যাতায়াতের জন্য রয়েছে একমাত্র সড়ক। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের অবস্থাও বেহাল। খানাখন্দে ভরা সড়ক দিয়ে যাত্রী ও যানবাহন চলাচলে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। স্টেশনের প্রবেশপথের সড়কটি দ্রুত সংস্কার করে নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা করা অতি জরুরি হয়ে পড়েলেও স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃপক্ষ নীরব ভূমিকা পালন করে।
মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশন দিয়ে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করে। খুলনা থেকে ঢাকাগামী বেনাপোল এক্সপ্রেস, সুন্দরবন এক্সেপ্রেস, চিত্রা এক্সেপ্রেস ও লোকাল নকশীকাঁথা ট্রেন এই স্টেশনে যাতায়াত করে। মোবারকগঞ্জ স্টেশন মাস্টার শাহাজান শেখ বলেন, এ স্টেশন থেকে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৯০০ যাত্রী বিভিন্ন প্রান্তে আসা-যাওয়া করেন। স্টেশনটি আধুনিকায়ন, নিরাপত্তা ক্যাম্প স্থাপন এবং ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হলে যাত্রীদের ভালো সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।
কালীগঞ্জ থানার ওসি জুলফিকার আলী বলেন, ‘আমি সবেমাত্র যোগদান করেছি। মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশনের যাত্রীদের বিশেষ করে রাতের বেলা সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভার প্রশাসক রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, ‘মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশন অভিমুখের প্রধান সড়কটি সংস্কারের জন্য আমি উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু রাস্তার কাজ করতে গেলে রেল কর্তৃপক্ষের আপত্তির কারণে করা সম্ভব হয়নি। সড়কবাতির ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে প্রতিটি বৈদ্যুতিক খুঁটিতে লাইট লাগানোর ব্যবস্থা করব।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

