দিনদিন আমদানি কমে যাওয়ায় চুয়াডাঙ্গার দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলওয়ে স্টেশনে কমে যাচ্ছে রাজস্ব আহরণের হার। গত দুই বছরের ব্যবধানে এ রেলওয়ে স্টেশন থেকে রাজস্ব কমেছে প্রায় ১৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। শুধু দর্শনা নয়, জাতীয় পর্যায়েও বদলে গেছে বাণিজ্যের হিসাব-নিকাশ। ১৬ বছর পর বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারির অবস্থান হারিয়েছে ভারত। সে জায়গা দখল করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যে কারণে কোলাহল আর কর্মব্যস্ততা নেই দর্শনা রেলইয়ার্ডে। এখানে অল্প পরিসরে পণ্য আসলেও তা অন্যত্র খালাস হচ্ছে। ফ্লাইঅ্যাশ ও সয়াবিনের ভুসি মাঝে মাঝে ভারত থেকে দেশে আসে। ফলে সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। দর্শনার স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভারত থেকে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলপথ দিয়ে মালবাহী ওয়াগনে করে পণ্য আমদানি করেন ব্যবসায়ীরা। দেশের শুধু এ পথ দিয়েই দ্রুত সময়ে পণ্য আমদানি ও খালাসের পর নির্দিষ্ট স্থানে চাহিদামতো সরবরাহ সম্ভব। নানা সমস্যার কারণে ব্যবসায়ীরা ভারত থেকে এলসির মাধ্যমে তাদের চাহিদামতো পণ্য আমদানি করতে পারছেন না। কিছু ব্যবসায়ী সামান্য পণ্য আমদানি করলেও তা অন্যত্র খালাস হচ্ছে। রেলইয়ার্ড এলাকায় সুনসান নীরবতা নেমে এসেছে।
তারা বলেন, রেলইয়ার্ডে সিএন্ডএফ এজেন্ট, ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ী, চালকরা অলস সময় পার করছেন। কাজ না থাকায় শ্রমিকরা ইয়ার্ড ছেড়েছেন। আমদানি না হওয়ায় কাজ একদম কমে আসায় বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকে অফিসগুলো। ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হচ্ছে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিগুলো।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভারত থেকে মালবাহী ওয়াগনে করে একসময় ভুট্টা, পাথর, পেঁয়াজ, চাইনা ক্লে, ফ্লাইঅ্যাশ, জিপসামসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি হতো । এখন ভারত থেকে আসছে শুধু ফ্লাইঅ্যাশ (ছাই) ও সয়াবিন ভুসি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩ হাজার ৩১৫ ওয়াগনে ৭ লাখ ১৫ হাজার টন পণ্য আমদানি হয়। যাতে রাজস্ব আয় হয় ৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ হাজার ৪৮৬ ওয়াগনে করে ২ লাখ ৫২ হাজার ১০১ টন পণ্য আমদানি হয়। যা থেকে রাজস্ব আয় হয় ১১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯ হাজার ৭৪৯ ওয়াগনে ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৫৫৯ টন পণ্য আমদানি হয়। যা থেকে রাজস্ব আয় হয় ২৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এ হিসেবে গত দুই বছরের ব্যবধানে এ রেলওয়ে স্টেশন থেকে রাজস্ব কমেছে প্রায় ১৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। শুধু দর্শনা নয়, জাতীয় পর্যায়ের চিত্র একই ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাজস্ব বোর্ডের হিসেবে গত অর্থবছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানি কমেছে প্রায় সাড়ে সাত শতাংশ। আর রপ্তানি কমেছে প্রায় তিন শতাংশ। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। আর বড় ব্যবধানে শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছে চীন।
বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের বলেন, দর্শনা আন্তর্জাতিক রেল স্টেশন এবং শুল্ক স্টেশন। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের বিদায়ে দুই দেশের কূটনৈতিক সমস্যার কারণে মালামাল আসা কিছুটা স্থবির হয়ে পড়েছে। দুদেশের সরকারের যদি সদিচ্ছা থাকে, তাহলে আবার এই শুল্ক স্টেশন প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসবে বলে আমরা মনে করি।
দর্শনা পৌরসভার সাবেক মেয়র সিএন্ডএফ এজেন্ট আতিয়ার রহমান হাবু জানান, আমাদের দর্শনা এলাকা বেশিরভাগই ছিল পোলট্রি শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। সেক্ষেত্রে পোলট্রি ফিডসহ অন্যান্য মালামাল ব্রাজিল থেকে জাহাজের মাধ্যমে আসার কারণে এবং ভারতসহ আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি থাকার কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেভাবে মালামাল এদিক দিয়ে আসেনি। তবে বর্তমানে যেভাবে আসতে শুরু করেছে এবং সামনে গমসহ অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য আসতে পারে, সেক্ষেত্রে আমাদের রেভিনিউ বাড়বে নিশ্চিত।
দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলওয়ে স্টেশন (ভারপ্রাপ্ত) সুপারিনটেনডেন্ট নাজমা ইয়াসমিন বলেন, দর্শনা আমাদের আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন এবং রাজস্ব আদায়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুট। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দর্শনা রুট দিয়ে ফ্লাইঅ্যাশ (ছাই-সিমেন্ট তৈরিতে ব্যবহৃত হয়), ডিসেন্ট স্টোন চিপস, ডিওসি এবং অন্যান্য মালামালসহ ২ লাখ ৫২ হাজার ১০৪ টন পণ্য এসেছে এবং ২০২৫-২৬ এ তা দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ৩ হাজার ৪৭৭ টন। এ থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ে আর্নিং করেছে ১১ কোটি ৪০ লাখ ৭ হাজার ৯৭৮ টাকা। ২০২৫-২৬ সালে আমরা আর্নিং করেছি ৮ কোটি ২৮ লাখ ৬৭২ টাকা। গত অর্থবছরের তুলনায় ২৫-২৬ অর্থবছরে কিছুটা আর্নিং কমেছে। আমরা আশা করছি মালগাড়িগুলো যদি আগের তুলনায় আরো বৃদ্ধি পায়, পণ্যগুলো আসা শুরু করে তাহলে ২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেলওয়ের রাজস্ব আয় আরো বৃদ্ধি পাবে।
চুয়াডাঙ্গার দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলওয়ে শুল্ক স্টেশনে আমদানি বাড়লে কমবে আমদানি ব্যয় ও সময়। কর্মসংস্থান ফিরে পাবে শ্রমিকরা। বাড়বে সরকারের রাজস্ব আহরণের হার। এজন্য সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রত্যাশা করেছেন এ জেলার মানুষ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

