কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার হাওরাঞ্চলে অতিবৃষ্টি, উজানের ঢল ও বিরূপ আবহাওয়ার থাবায় কৃষকের সোনালি স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। একরের পর একর জমির ধান তলিয়ে যাওয়া এবং অর্জিত ফসলের গুণগত মান নষ্ট হওয়ায় হাবেলিপাড়ার প্রান্তিক কৃষকদের চোখে এখন কেবলই অন্ধকার।
তেমনই একজন ভুক্তভোগী হাবেলিপাড়ার কৃষক মো. মালেক (৬২)। নিজের জমি না থাকায় চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ২০ একর জমিতে হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে বোরো আবাদ করেছিলেন তিনি। আশা ছিল, বাম্পার ফলনে ঋণের টাকা শোধ করে পরিবারের মুখে সারা বছরের অন্ন তুলে দেবেন। কিন্তু প্রকৃতির নিষ্ঠুরতায় তিনি এখন সর্বস্বান্ত।
সরেজমিনে দেখা যায়, খলায় ভেজা ও বিবর্ণ ধানের ওপর নির্বাক হয়ে বসে আছেন মালেক। ক্ষোভ ও আক্ষেপ নিয়ে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, “ঋণ করে ২০ কানি জমি করছিলাম, মাত্র ৫ কানি কাটতে পারছি। বাকি ১৫ কানি পানির তলে। আর যে ৫ কানি কষ্ট করে কাইটা আনছি, এই ধানের রঙ দেইখা কোনো বেপারী দাম করতে আইতাছে না।”
তিনি আরও জানান, এখন মাঠের বাকি ধান কেটে আনতে যে পরিমাণ শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন খরচ লাগবে, ধান বিক্রি করে সেই টাকাও উঠবে না। ফলে বাকি ১৫ একর জমির ধান মাঠেই ফেলে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন তিনি। গলায় ঋণের ফাঁস আর হাতে নষ্ট ধান নিয়ে মালেক মিয়ার জিজ্ঞাসা— “এখন ঋণ শোধ করমু না সংসার চালামু? চিন্তায় রাইতে ঘুম হয় না, চোখে অন্ধকার দেখতাছি।”
একই দশা দাসপাড়ার মো. রেজাউল ইসলাম রেজুর (৭২)। তিনি বলেন, “৩০ একরের মধ্যে ১৫-১৬ একর জমি কাটছি, বাকি সব পানির নিচে। যে ধান কেটে আনছিলাম, সেগুলোর অবস্থাও খুব খারাপ।”
এদিকে গত ২ মে ২০২৬ তারিখ উপজেলার দেওঘর ইউনিয়নের আলীনগর গ্রামের কৃষক ও চার সন্তানের জনক মো. আখতার হোসেন (৬০) ঋণের বোঝা আর ফসলের শোক সইতে না পেরে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে পরলোকগমন করেন।
অষ্টগ্রামের হাজারো কৃষকের এখন এমনই করুণ অবস্থা। একদিকে প্রকৃতির বৈরিতা, অন্যদিকে মহাজন ও এনজিওর কিস্তির চাপ—এই দুই যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে হাওরের কৃষককুল এখন দিশেহারা। সরকারি বা বেসরকারিভাবে বিশেষ সহায়তা না পেলে মো. মালেকের মতো হাজারো কৃষকের পক্ষে এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

