সীমান্তবর্তী শেরপুর জেলার গারো পাহাড়ে ক্রমেই বাড়ছে বিলুপ্তপ্রায় এশিয়ান প্রজাতির হাতির বিচরণ। নালিতাবাড়ী, শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতির প্রায় ৪২ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত পাহাড়ি বনাঞ্চলে নিয়মিত দেখা মিলছে শাবকসহ হাতির পাল। বন সংরক্ষণ, খাদ্য উপযোগী গাছ রোপণ এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের ফলে এলাকাটি ধীরে ধীরে দেশের অন্যতম প্রাকৃতিক এলিফ্যান্ট করিডোর হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সবুজ পাহাড়, গভীর বন আর হাতির অবাধ বিচরণÑএ বিরল দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই শেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত মানুষ ছুটে আসেন গারো পাহাড়ে। অনেকেই এলাকাটিকে প্রাকৃতিক সাফারি পার্কের সঙ্গে তুলনা করছেন। তবে কোনো কৃত্রিম সীমানা বা নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় মানুষ ও হাতির উভয়ের জন্যই ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।
শেরপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য প্রকৌশলী ফাহিম চৌধুরীর উদ্যোগে হাতির সুরক্ষায় বিশেষ পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। শেরপুরের পাহাড়ি জনপদের মানুষের জানমাল রক্ষা এবং হাতির আক্রমণ থেকে বাঁচতে কিছু অভিনব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হাতির গতিবিধি পর্যবেক্ষণে এবার হাতির চলাচলের পথে বসানো হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিসম্পন্ন ক্যামেরা বা আরলি ডিটেকশন ডিভাইস। এর পাশাপাশি হাতির পানি পান ও গোসলের জন্য পাহাড়ের ভেতরে তৈরি করা হবে বেশ কিছু কৃত্রিম জলাধার। হাতির বিচরণক্ষেত্রে বেশ কিছু গভীর সাবমার্সিবল পাম্পযুক্ত জলাধার তৈরি করা হবে। যেসব এলাকায় হাতির অবস্থান বেশি সেখানে প্রয়োজনীয়সংখ্যক জলাধার খনন করা হবে। প্রাকৃতিক উৎসের পানি ধরে রাখার পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট মেটাতে গভীর সাবমার্সিবল পাম্প স্থাপন করা হবে যা নিরাপদ দূরত্ব থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এর ফলে হাতি বনের ভেতরেই পর্যাপ্ত পানি পাবে এবং পানির সন্ধানে লোকালয়ে আসার প্রবণতা অনেকটাই কমে যাবে।
একই সঙ্গে বন বিভাগের নেওয়া সোলার ফেন্সিং, বায়ো ফেন্সিং এবং হাতির খাদ্য উপযোগী বাগান তৈরির মতো প্রকল্পগুলো যাতে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, সে লক্ষ্যে বন বিভাগকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বন বিভাগের তথ্যমতে, শেরপুর জেলার পাহাড়ি জনপদে গত ১৬ বছরে মানুষ-হাতির দ্বন্দ্বে প্রাণ গেছে ৪৬ জন মানুষের। এছাড়া হাতির আক্রমণে ঘরবাড়ি, গাছপালাসহ কয়েক কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে। একই সময়ে হাতি মারা গেছে ৩৪টি।
এ বিষয়ে শেরপুর ওয়ার্ল্ডলাইফ বিভাগের রেঞ্জার আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, আমাদের এ অঞ্চলে খাদ্য সংকটের কারণে হাতি লোকালয়ে চলে আসায় মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্ব লেগে যায়। তবে সম্প্রতি সরকারের উদ্যোগে জেলার পাহাড়ি বনাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ছয় একর জমিতে হাতির খাদ্যবান্ধব গাছ রোপণ করা হয়েছে। এগুলোর বয়স প্রায় তিন বছর হয়েছে। আগামী আরো দুই-তিন বছরের মধ্যে গাছগুলো পরিপূর্ণভাবে হাতির খাদ্য উপযোগী হয়ে উঠলে সংকট নিরসন হবে বলে আমরা মনে করছি।
সংসদ সদস্য ফাহিম চৌধুরী বলেন, হাতি আমাদের দেশের সম্পদ, তাই কোনোভাবেই হাতির ক্ষতি করা যাবে না। আমি ইআরটি সদস্যদের সম্মানী ভাতা বাড়ানোর জন্য উচ্চপর্যায়ে কথা বলব। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের দক্ষ করে তোলা হবে। এআই ক্যামেরা ও জলাধার নির্মাণের পাশাপাশি বন বিভাগের প্রকল্পগুলো যাতে শতভাগ সফল হয়, আমি নিজে তা তদারকি করব। মানুষ ও হাতির সহাবস্থান নিশ্চিত করতে যা যা প্রয়োজন, তার সবই করা হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

