গাজীপুরের পথে দুই পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ

গাজীপুরের পথে দুই পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ
স্বজনদের আহাজারী । ইনসেটে নিহত মমতা ও আকরাম দম্পত্তি। ছবি: আমার দেশ

গাজীপুরে যাওয়া হলো না লেবুর পরিবারের। মা, মেয়ে ও নাতিকে নিয়ে বেরিয়ে চারজনই ফিরলেন লাশ হয়ে।

বৃহস্পতিবার গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন মোফাজ্জল হোসেন লেবু (৫৫)। উদ্দেশ্য ছিল মা রশিদা বেগম (৮৫), মেয়ে মর্জিনা বেগম (২৫) ও পাঁচ বছরের নাতি মিলানকে সঙ্গে নিয়ে গাজীপুরের হোতাপাড়ার ভাড়া বাসায় ফেরা। সেখানে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণশ্রমিকের কাজ করতেন তিনি। কিন্তু গাজীপুরের সেই ভাড়া বাসায় আর ফেরা হলো না তাঁর।

বিজ্ঞাপন

শুক্রবার সকালে জামালপুর সদর উপজেলার দড়ি হামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামের বাড়ি থেকে মা, মেয়ে ও নাতিকে নিয়ে নান্দিনা বাজারে যান লেবু। সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ময়মনসিংহ-ঢাকা বাইপাসের দিকে রওনা হন। পরিকল্পনা ছিল বাইপাস থেকে বাসে করে গাজীপুরে যাবেন। আকুয়া বাইপাস মোড়েই থেমে যায় সেই যাত্রা। বিপরীত দিক থেকে আসা দ্রুতগতির রাজিব পরিবহনের একটি বাস অটোরিকশাটিকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই মারা যান মোফাজ্জল হোসেন লেবু, তার বৃদ্ধা মা রশিদা বেগম, মেয়ে মর্জিনা ও নাতি মিলান। স্বজনেরা জানান, মর্জিনা অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।

একসঙ্গে চারটি লাশ। একটি পরিবারের গাজীপুর যাত্রা মুহূর্তেই পরিণত হলো শোকযাত্রায়। ছোট ভাই মোবারক হোসেন যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না এই পরিণতি। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘মা, ভাতিজি আর নাতিকে নিয়ে গাজীপুরে যাওয়ার কথা ছিল ভাইয়ের। সবাইকে নিয়ে বেড়াবে, একসঙ্গে থাকবে, এই ছিল পরিকল্পনা। কিন্তু কেউ আর গাজীপুরে পৌঁছাতে পারল না।’

কথাগুলো বলতে বলতে বারবার থেমে যাচ্ছিলেন তিনি।

যে মানুষটি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কর্মস্থলে ফিরতে বেরিয়েছিলেন, সেই মানুষটির সঙ্গে একই দুর্ঘটনায় হারিয়ে গেলেন তাঁর মা, মেয়ে ও নাতি। একটি পরিবারের চার প্রজন্মের স্মৃতি যেন কয়েক মুহূর্তেই থেমে গেল আকুয়া বাইপাসের সড়কে।

এখন আর গাজীপুরের সেই ভাড়া বাসায় ফেরার অপেক্ষা নেই। নেই মায়ের জন্য ছেলের, মেয়ের জন্য বাবার কিংবা নাতির জন্য পরিবারের সদস্যদের অপেক্ষাও। আছে শুধু চারটি লাশ আর স্বজনদের বুকভরা প্রশ্ন, একসঙ্গে বের হওয়া মানুষগুলো কেন আর একসঙ্গে ঘরে ফিরল না?

দুই হাজার টাকা নিয়ে বেরিয়েছিলেন মমতা। কর্মস্থলে ফেরা হলো না, দুই মেয়েকে রেখে নিথর হয়ে ফিরলেন মা।

সকালে মায়ের কাছ থেকে দুই হাজার টাকা নিয়েছিলেন মমতা বেগম (৩৯)। টাকা নিয়ে বেরিয়েছিলেন আবার কর্মস্থলে ফিরবেন বলে। ময়মনসিংহের ভালুকার একটি গার্মেন্টে কাজ করতেন তিনি। এক মাস আগে চাকরি ছেড়ে বাড়িতে এসেছিলেন। এবার নতুন করে কাজে যোগ দেওয়ার কথা।।সংসারের অভাব মেটাতে স্বামী আকরাম হোসেনও তার সঙ্গে যাচ্ছিলেন। নির্মাণশ্রমিক আকরাম আর গার্মেন্টকর্মী মমতার আয়ে চলত তাঁদের দুই মেয়েকে নিয়ে ছোট্ট সংসার। কিন্তু কর্মস্থলে আর ফেরা হলো না মমতার।

জামালপুর সদর উপজেলার শরিফপুর বাজার থেকে স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ময়মনসিংহের দিকে যাচ্ছিলেন তিনি। সেখান থেকে বাসে করে ভালুকায় যাওয়ার কথা ছিল। আকুয়া বাইপাস মোড় অতিক্রমের সময় দ্রুতগতির রাজিব পরিবহনের বাস অটোরিকশাটিকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই মারা যান মমতা ও তার স্বামী আকরাম।

সকালে যে দুই হাজার টাকা হাতে নিয়ে মেয়ে কর্মস্থলের উদ্দেশে বেরিয়েছিলেন, সেই মেয়েকেই কয়েক ঘণ্টা পর নিথর অবস্থায় দেখতে হলো মা রাশেদা বেগমকে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘মমতা কাজে যাবে বলে আমার কাছ থেকে দুই হাজার টাকা নিয়েছিল। শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার পথে টাকা হারিয়ে ফেলেছিল। টাকা হারানোর পর আমি যেতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু আমার কথা শোনেনি। এখন মেয়েটা বাড়িতে ফিরল, কিন্তু লাশ হয়ে।’

মায়ের এই কথার পর যেন আর কিছু বলার থাকে না।

মমতার ভাতিজা সাজ্জাদ হোসেন পাপন বলেন, ‘চাচি ভালুকার একটি গার্মেন্টে কাজ করতেন। চাচা নির্মাণশ্রমিক। দুজনের আয়েই সংসার চলত। এক মাস আগে চাকরি ছেড়ে বাড়িতে এসেছিলেন চাচি। নতুন করে কাজে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু আর যাওয়া হলো না।’

মমতা ও আকরামের ঘরে রয়েছে দুই কন্যাসন্তান। তাদের বড় করার স্বপ্ন ছিল বাবা-মায়ের। অভাবের সংসারে একটু স্বস্তি আনতে আবার কাজে ফিরছিলেন মমতা। তার হাতে ছিল মায়ের কাছ থেকে নেওয়া দুই হাজার টাকা সংসারের জন্য সামান্য হলেও সেই টাকার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল পরিবারের বেঁচে থাকার স্বপ্ন।

সেই স্বপ্নই থেমে গেল আকুয়া বাইপাসে। এখন দুই মেয়ের সামনে বাবা-মা দুজনকেই হারানোর শূন্যতা। আর মায়ের সামনে শুধু মেয়ের সেই শেষ কথাগুলো কাজে যাওয়ার কথা বলে যে মেয়ে বেরিয়েছিল, সে ফিরেছে লাশ হয়ে।

সড়কে একটি মুহূর্তের বেপরোয়া গতির পরিণতি যে কত বড় হতে পারে, মমতা-আকরামের ঘরের শোক যেন তারই নির্মম সাক্ষ্য।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...