জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

ময়মনসিংহ অঞ্চলে শ্রমজীবী মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে

আব্দুল কাইয়ুম, ময়মনসিংহ

ময়মনসিংহ অঞ্চলে শ্রমজীবী মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে

ময়মনসিংহে কয়েক দিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। কোথাও মাঝারি, কোথাও ভারী বর্ষণ। গত বুধবার ময়মনসিংহে ১৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, যা দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ। বৃষ্টির পর বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতা, ভ্যাপসা গরম এবং দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্বল বায়ুপ্রবাহের কারণে খোলা আকাশের নিচে কাজ করা কৃষক, নির্মাণশ্রমিক, ইটভাটা শ্রমিক, রিকশাচালক ও দিনমজুরদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরো বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি আর স্বাভাবিক মৌসুমি আবহাওয়ার বিষয় নয়; জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ময়মনসিংহ অঞ্চলে নতুন ধরনের আবহাওয়ার ধারা তৈরি হয়েছে। দিনে তাপমাত্রা বেশি, রাতে অথ্যধিক আর্দ্রতা, বিকালে বজ্রসহ বৃষ্টি এবং এরপর আবার ভ্যাপসা গরম—পরিবর্তিত এই চক্র জনস্বাস্থ্য, কৃষি উৎপাদন ও শ্রমবাজারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ৮ জুলাইয়ের পূর্বাভাসে বলা হয়, আগামী পাঁচদিন ময়মনসিংহ বিভাগে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি, বজ্রসহ বৃষ্টিপাত এবং কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে দিনের তাপমাত্রা সামান্য কমলেও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকবে। পাঁচদিন পর বৃষ্টির প্রবণতা কিছুটা কমতে পারে।

অন্যদিকে জুলাই-সেপ্টেম্বরের মৌসুমি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এ সময়ে ময়মনসিংহ বিভাগে ৪২০ থেকে ৪৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হতে পারে। একই সঙ্গে দিনের ও রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। জুলাই মাসে তিন থেকে পাঁচদিন মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ এবং ১০ থেকে ১৫ দিন বজ্রসহ ঝড় হওয়ার আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

মে, জুন ও জুলাই মাসের আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, টানা তিন মাস ধরে ময়মনসিংহে বাতাসের গতি অধিকাংশ দিন মাত্র তিন থেকে চার নটসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। একই সময়ে তাপমাত্রা ৩২ থেকে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করে এবং বাতাসে আপেক্ষিক আর্দ্রতা অনেক সময় ৭০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়।

ময়মনসিংহ বিভাগীয় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের পরিচালক ডা. প্রদীপ কুমার সাহা আমার দেশকে বলেন, আগের তুলনায় এখন বাতাসের তাপমাত্রা বেড়েছে। এর সঙ্গে দুর্বল বায়ুপ্রবাহ ও বাতাসে উচ্চ আর্দ্রতা যুক্ত হওয়ায় শরীরের ঘাম সহজে শুকাতে পারে না। ফলে শরীরের স্বাভাবিক তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হয় এবং প্রকৃত তাপমাত্রার তুলনায় অনেক বেশি গরম অনুভূত হয়। এতে তাপজনিত অবসাদ, পানিশূন্যতা, হিটস্ট্রোক, কিডনির জটিলতা এবং কর্মক্ষমতা হ্রাসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। গত কয়েক বছরে হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিনি আরো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন এ বাস্তবতায় তাপজনিত অসুস্থতা মোকাবিলায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে শুরু করে জেলাপর্যায়ের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আরো দক্ষ ও প্রশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রস্তুতি নিশ্চিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে আরো কার্যকর ও উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে।

ময়মনসিংহ সদর, গৌরীপুর, নান্দাইল, ফুলবাড়িয়া ও ত্রিশাল উপজেলার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৃষ্টির মধ্যেও ফসলি জমিতে কাজ করতে হয়। কিন্তু বৃষ্টি থামার কিছুক্ষণ পরই মাঠে ভ্যাপসা গরমে দীর্ঘ সময় কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক শ্রমিকই মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, অতিরিক্ত ক্লান্তি ও শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যার কথা জানিয়েছেন। অধিকাংশ কৃষিজমির পাশে গাছপালা বা ছায়াযুক্ত বিশ্রামস্থল না থাকায় তারা প্রয়োজনমতো বিশ্রামও নিতে পারেন না।

একই চিত্র নির্মাণশ্রমিক ও ইটভাটা শ্রমিকদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে। নির্মাণশ্রমিক মো. জুবায়েরের অভিযোগ, অধিকাংশ কর্মস্থলে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানীয়জল, ছায়াযুক্ত বিশ্রামস্থল কিংবা নির্ধারিত বিরতির ব্যবস্থা নেই। অন্যদিকে ইটভাটায় চুল্লির তাপ এবং বাইরের ভ্যাপসা গরম মিলিয়ে শরীরের ওপর দ্বিগুণ চাপ সৃষ্টি হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক আব্দুল মাজেদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ার স্বাভাবিক চক্র বদলে গেছে। এখন আগাম বৃষ্টি হচ্ছে, হঠাৎ তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দিচ্ছে। বর্তমানে আমন ধান রোপণের মৌসুমে কৃষিশ্রমিকদের দীর্ঘ সময় মাঠে কাজ করতে হচ্ছে। কিন্তু অধিকাংশ জমির পাশে গাছপালা বা ছায়াযুক্ত স্থান না থাকায় তারা কিছুক্ষণ পরপর বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পান না। ফলে অতিরিক্ত গরমে হিটস্ট্রোকসহ বিভিন্ন তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ছে।

তিনি আরো বলেন, গত দুই দশকে ময়মনসিংহ অঞ্চলে গ্রীষ্মকালের তাপমাত্রা ক্রমাগত বেড়েছে। শীতকাল ছোট হয়ে এসেছে, বোরো ধানে সেচের চাহিদা বেড়েছে, আমন রোপণের সময়েও পরিবর্তন এসেছে। ভুট্টা ও সবজিতে নতুন রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ বাড়ছে। নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের হাওর এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় আগাম বন্যা কৃষি উৎপাদনের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, ময়মনসিংহে বজ্রপাতের প্রবণতাও উদ্বেগজনক। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা থেকে আসা আর্দ্র বায়ু, উত্তরাঞ্চল থেকে নেমে আসা তুলনামূলক শীতল বাতাস এবং বিস্তীর্ণ খোলা কৃষিজমির কারণে এ অঞ্চলে সহজেই বজ্রমেঘ সৃষ্টি হয়।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মুরাদ আহমেদ ফারুক বলেন, ময়মনসিংহে এখন যে আবহাওয়ার চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা সাময়িক নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের অংশ। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ১০ থেকে ২০ বছরে গড় তাপমাত্রা আরো বাড়বে, শ্রম উৎপাদনশীলতা কমবে, খরা ও পানির সংকট বৃদ্ধি পাবে, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের প্রভাব জলাশয়ে গিয়ে মাছের উৎপাদন ও খাদ্যের গুণগত মানেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ময়মনসিংহ আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার অফিস সূত্রে জানা গেছে, বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে ইতোমধ্যে ময়মনসিংহে বজ্রপাত প্রতিরোধক ব্যবস্থা (লাইটনিং প্রোটেকশন সিস্টেম) স্থাপন করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ, সম্প্রসারণ ও সমন্বিত উদ্যোগের গতি এখনো সন্তোষজনক নয়। ফলে বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় প্রত্যাশিত সুফল পুরোপুরি মিলছে না।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ খোরশেদ আলম আমার দেশকে বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রতি বছরই তাপমাত্রা বাড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর পড়ছে। বিশেষ করে কৃষক, নির্মাণশ্রমিক, ইটভাটা শ্রমিক, রিকশাচালক ও খোলা আকাশের নিচে দীর্ঘ সময় কাজ করা মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

তিনি আরো বলেন, শুধু তাপমাত্রা নয়; অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও দুর্বল বায়ুপ্রবাহের কারণে শরীর স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা হতে পারে না। ফলে হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

হিটস্ট্রোক একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি, সময়মতো চিকিৎসা না পেলে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তাই অতিরিক্ত গরমের সময় পর্যাপ্ত পানি পান, প্রয়োজন ছাড়া দুপুরের প্রখর রোদে দীর্ঘ সময় কাজ না করা, ছায়াযুক্ত স্থানে নিয়মিত বিশ্রাম নেওয়া এবং হিটস্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন