একসময় মানুষের প্রধান বিনোদন ও সংবাদমাধ্যম ছিল টেলিভিশন। সন্ধ্যা নামলেই পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে খবর, নাটক কিংবা বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখত। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, মোবাইল ফোনের ব্যাপক ব্যবহার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারে ময়মনসিংহে দিনে দিনে কমে যাচ্ছে টেলিভিশনের দর্শক। পাশাপাশি কমছে ডিশ সংযোগের গ্রাহকও।
শহরের বিভিন্ন ডিশ ব্যবসায়ী ও সাধারণ দর্শকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পরিবার ক্যাবল সংযোগ বাতিল করেছে। অনেক বাসায় এখন টেলিভিশন থাকলেও সেটি সংবাদ বা বিনোদনের জন্য নয় বরং সিসি ক্যামেরার স্ক্রিন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
নগরীর সিকে ঘোষ রোডের বাসিন্দা ফজলুল হক বলেন, আগে একটি পরিবারে একাধিক টেলিভিশন থাকত। ভিন্ন ভিন্ন রুমের জন্য আলাদা টিভি কেনা হতো। কিন্তু এখন নতুন টিভি কেনার প্রবণতা কমেছে গেছে।
নগরীর জামান ইলেকট্রনিক্সের ম্যানেজার সজল মিয়া জানান, আগের মতো এখন আর টিভি বিক্রি হয় না। মানুষের হাতে হাতে মোবাইল থাকায় টিভির চাহিদা কমে গেছে।
স্থানীয় সাংবাদিক জগলুল পাশা রুশো জানান, মানুষের হাতে হাতে স্মার্টফোন পৌঁছে যাওয়ার ফলে টেলিভিশনের প্রয়োজনীয়তা কমে গেছে। মানুষ এখন খবর, বিনোদন, গান, নাটক—সবকিছুই মোবাইলে দেখছে । আগে পাঁচ মিনিটের গান বা অনুষ্ঠান দেখার ধৈর্য থাকলেও এখন ৩০ সেকেন্ডের শর্ট ভিডিওতেই মানুষ বিনোদন খুঁজে নিচ্ছে। দ্রুত বদলে যাওয়া এই অভ্যাস মানুষের মনোযোগ ও ধৈর্যের ওপরও প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছে সচেতন মহল।
অনেকেই অভিযোগ করেন, টেলিভিশনে এখন নির্ভরযোগ্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ কমে গেছে। গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থের খবরের পরিবর্তে অধিকাংশ চ্যানেলে দলীয় গুণগান বেশি প্রচার করা হয় বলে দর্শকের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে। এসব কারণে মানুষ ধীরে ধীরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইনভিত্তিক কনটেন্টের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে অনেক সাংবাদিকও এখন মোজো (মোবাইল জার্নালিজম) রিপোর্টিংয়ের দিকে ঝুঁকছেন। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে সরাসরি রিপোর্টিংয়ের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। ঘটনাস্থল থেকে তাৎক্ষণিক ভিডিও, লাইভ ও তথ্য প্রকাশের কারণে দর্শকও এখন টেলিভিশনের জন্য অপেক্ষা না করে মোবাইলেই সংবাদ দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন।
নগরীর কলেজ শিক্ষক ফয়সাল করীম বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্থানের ফলে একদিকে যেমন দ্রুত তথ্যপ্রবাহ বাড়ছে; অন্যদিকে পেশাদার সাংবাদিকতা ও যাচাইকৃত তথ্যের সংকটও তৈরি হচ্ছে। ফলে মানুষ যেমন টেলিভিশন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, তেমনি সমাজে অস্থিরতা, বিভ্রান্তি ও তথ্যের বিশৃঙ্খলাও বাড়ছে।
ময়মনসিংহ মাল্টিক্যাবল সিস্টেমের পরিচালক ফরহাদ আলম বলেন, আগে মানুষ টিভিকে খবর ও বিনোদনের প্রধান মাধ্যম মনে করত। এখন সবাই মোবাইলে ব্যস্ত। আগের তুলনায় ডিশের গ্রাহক দুই-তৃতীয়াংশ কমেছে।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা মনে করছেন, টেলিভিশনের কনটেন্টের মানোন্নয়ন না হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরো সংকটাপন্ন হতে পারে। তাদের ভাষায়, সাংবাদিকরা কেবল তথ্য পরিবেশনকারী নন, তিনি একাধারে সমাজ-সংস্কৃতির নির্মাতা, সাহিত্যিক ও শিল্পসত্তারও বাহক। কিন্তু সেই গভীরতা ও সৃজনশীলতা অনেক ক্ষেত্রেই হারিয়ে যাচ্ছে। সে সঙ্গে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ, মানসম্মত বিনোদন ও সময়োপযোগী কনটেন্ট ছাড়া হারানো দর্শক ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


আগের চেয়ে ভালো হবে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক: ট্রাম্প