সুলতানের এক কাপ চায়ে ৩০ বছরের জীবনের গল্প

শওকত জামান, জামালপুর

সুলতানের এক কাপ চায়ে ৩০ বছরের জীবনের গল্প
সুলতান মিয়ার জীবনযুদ্ধ। ছবি: আমার দেশ

কথাকলি মার্কেটের পশ্চিম পাশে ছোট্ট টংঘর। চুলার ওপর ধোঁয়া ওঠা কেটলি, পাশে সাজানো চায়ের উপকরণ। আর সেই চেনা হাসিমুখের মানুষটি ব্যস্ত আপন মনে। তিনি সুলতান মিয়া। তিন দশক ধরে চা বিক্রি করেই চলছে তার জীবন।

সকাল থেকে সন্ধ্যা। প্রতিদিনই তার ছোট্ট দোকানে আসে নানা শ্রেণির মানুষ। কেউ চায়ের কাপে খোঁজেন ক্লান্তির অবসান, কেউ খোঁজেন পরিচিত মুখের আন্তরিকতা। সুলতান ভাইয়ের কাছে চা শুধু একটি পানীয় নয়, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির এক মাধ্যম।

বিজ্ঞাপন

সহজ-সরল স্বভাবের সুলতান মিয়া মৃদু হাসিতে ক্রেতাদের আপ্যায়ন করেন। তার হাতে তৈরি বিভিন্ন ধরনের চায়ের মধ্যে তেঁতুল চায়ের আলাদা কদর রয়েছে। বিশেষ স্বাদের এই চা পান করতে অনেকেই নিয়মিত আসেন তার ছোট্ট দোকানে।

এই জায়গার অনেক পরিবর্তন দেখেছি

পুরোনো দিনের কথা মনে করতে গিয়ে সুলতান মিয়া বলেন, ‘কথাকলি সিনেমা হল যখন চালু ছিল, তখন এই এলাকায় মানুষের অনেক ভিড় ছিল। মার্কেট সবসময় জমজমাট থাকত। তখন অনেক বেশি চা বিক্রি হতো। মানুষের কোলাহলে মুখর থাকত পুরো এলাকা।’

সময় বদলেছে। বদলে গেছে চারপাশের চিত্র। আগের মতো ব্যস্ততা নেই, নেই সেই পুরোনো ভিড়। তবুও সুলতান মিয়ার চায়ের দোকানে এখনো নিয়মিত আসেন অনেক পরিচিত মানুষ। ভালোবাসা আর আস্থার কারণে টিকে আছে তার ছোট্ট ব্যবসা।

চায়ের সঙ্গে মিশে আছে মায়া

সুলতান ভাইয়ের দোকানে পাওয়া যায় বিভিন্ন স্বাদের চা। প্রতিটি চায়ের মধ্যেই রয়েছে আলাদা ফ্লেবার। তবে তার তৈরি চায়ের বিশেষত্ব শুধু স্বাদে নয়, রয়েছে আন্তরিকতায়ও।

তার ছেলে এখন বাবার কাজে সহযোগিতা করেন। বাবার কাছ থেকেই শিখেছেন চা তৈরির কৌশল। সুলতান মিয়ার ভাষায়, ‘ছেলের হাতেও ভালো চা হয়। সে আমার চেয়ে অনেক পারদর্শী।’

জীবনযুদ্ধে এখনো অদম্য

বয়সের ভারে শরীর আগের মতো নেই। স্বাস্থ্যও কিছুটা ভেঙে পড়েছে। কিন্তু জীবনযুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়াননি সুলতান মিয়া। প্রতিদিনের মতো এখনো তিনি বসেন তার ছোট্ট দোকানে, অপেক্ষা করেন পরিচিত ক্রেতাদের। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়ায় বিক্রি কমে যায়। আবার কোনো কোনো দিন ভালো বিক্রি হলে সংসারে আসে স্বস্তি। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে তার ছোট্ট সংসার চলছে সংগ্রাম আর আশার মধ্যদিয়ে।

একটি ছাদওয়ালা ঘরের স্বপ্ন

জীবনের এই প্রান্তে এসেও স্বপ্ন দেখেন সুলতান মিয়া। তার ইচ্ছা, সামর্থ্য হলে একদিন একটি ছাদওয়ালা ঘর ভাড়া নিয়ে একটু ভালো পরিবেশে চায়ের দোকান করবেন। ছোট্ট এই স্বপ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে তার বড় প্রত্যাশা। পরিশ্রমের মাধ্যমে একটু স্বস্তির জীবন।

কথাকলি মার্কেটের এই চা বিক্রেতা শুধু চা বিক্রি করেন না, তিনি বিক্রি করেন আন্তরিকতা, পরিচিতি আর দীর্ঘদিনের সম্পর্কের উষ্ণতা। তার এক কাপ চায়ের সঙ্গে মিশে থাকে ৩০ বছরের শ্রম, ভালোবাসা আর বেঁচে থাকার গল্প।

সুলতান ভাইয়ের দোকানে এক কাপ চা মানেই শুধু স্বাদ নেওয়া নয়; এটি একজন সংগ্রামী মানুষের জীবনের গল্পের সঙ্গে পরিচিত হওয়া।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...