আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বিলুপ্ত গ্রামীণ আড়ং-মেলা: হারিয়ে যাচ্ছে লোকজ ঐতিহ্য

জেলা প্রতিনিধি, নেত্রকোণা

বিলুপ্ত গ্রামীণ আড়ং-মেলা: হারিয়ে যাচ্ছে লোকজ ঐতিহ্য

একসময় অগ্রহায়ণ মাস এলেই গ্রামীণ জনপদে ফিরত আড়ং-মেলার উৎসব। ধানকাটা শেষে পূর্ব ময়মনসিংহ অঞ্চলের গ্রামে গ্রামে বসত এই লোকজ আয়োজন। পশুর লড়াই, গ্রামীণ খাবারের পসরা, গানবাজনা ও খেলাধুলা—সব মিলিয়ে আড়ং ছিল গ্রামীণ মানুষের সবচেয়ে বড় বিনোদনকেন্দ্র। সময়ের পরিক্রমায় সেই ঐতিহ্য আজ প্রায় বিলুপ্ত।

স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পূর্ব ময়মনসিংহ এলাকায় আড়ং মানেই ছিল উৎসবের দিন। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর—সবাই অংশ নিত এই আনন্দে। আত্মীয়স্বজনের দাওয়াত, মেয়েদের নাইয়র আনা ও মেহমানদারির মধ্য দিয়ে সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় হতো।

বিজ্ঞাপন

আড়ং-মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল পশুর লড়াই। ষাঁড়, মহিষ, ভেড়া ও মোরগের প্রতিযোগিতা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ জড়ো হতো। নির্ধারিত খোলা মাঠ ‘থলা’র চারপাশে বসত গ্রামীণ খাবারের দোকান—মুড়ি-মুড়কি, নাড়ু-লাডু, খাজা-গজা, সিংগারা-নিমকি, জিলাপিসহ নানা খাবার। পাশাপাশি চলত লোকগান, বাদ্যযন্ত্র ও বিভিন্ন খেলাধুলা।

আয়োজক কমিটির ব্যবস্থাপনায় বাঁশ ও রঙিন কাগজে সাজানো হতো থলা। পশুর আকারভেদে গ্রুপ করে সারাদিন ধরে চলত প্রতিযোগিতা। বিজয়ীদের জন্য থাকত বদল পশু, সাইকেল, রেডিও, টিভি কিংবা খাসি। বিজয়ী পশুকে নিয়ে ঢোল-সানাইয়ের তালে গ্রাম প্রদক্ষিণ ছিল আড়ংয়ের বিশেষ আকর্ষণ। কয়েক দিন ধরে পশু প্রদর্শনের মাধ্যমে বকশিস তোলা হতো, এতে পশুর বাজারমূল্যও বেড়ে যেত।

প্রচারের ধরনও ছিল ব্যতিক্রম। হাট-বাজারে ঢোল পিটিয়ে কিংবা খালি টিন বাজিয়ে আড়ংয়ের দিন-তারিখ ঘোষণা করা হতো। এতে পুরো এলাকায় ব্যাপক সাড়া পড়ত।

সংস্কৃতি গবেষকদের মতে, আড়ংয়ের শিকড় এ অঞ্চলের প্রাচীন লোকজ সংস্কৃতিতে। জলাভূমি ও টিলায় ঘেরা ভূপ্রকৃতিতে বসবাসকারী আর্য ও অনার্য জনগোষ্ঠীর পশুপালন ও বিনোদনচর্চা থেকেই এই উৎসবের বিকাশ। প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের চর্যাপদ-সংস্কৃতির সময়কাল থেকেই এ ধরনের লোকজ বিনোদনের ধারার অস্তিত্ব পাওয়া যায়।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আড়ংয়ের নামে জুয়া, ঝগড়া-বিবাদ ও মারামারির প্রবণতা বাড়ে। নিরাপত্তাহীনতা ও পারস্পরিক সৌহার্দের অভাবে একপর্যায়ে এই আয়োজন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে গ্রামীণ জীবন থেকে হারিয়ে যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ লোকজ উৎসব।

সংস্কৃতিপ্রেমীরা মনে করেন, আড়ং শুধু একটি মেলা নয়—এটি ছিল গ্রামীণ সমাজের মিলনমেলা ও ঐক্যের প্রতীক। যথাযথ গবেষণা, নথিভুক্তকরণ ও নিয়ন্ত্রিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সম্ভব। নইলে আড়ং থেকে যাবে শুধুই স্মৃতির পাতায়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন