কৃষকের কাছে সরকারি সার পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব যাদের হাতে যাওয়ার কথা, সেই ডিলার নিয়োগ ঘিরেই শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলায় উঠেছে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ। সারের ডিলার নিয়োগের অনুমোদিত তালিকায় সংসদ সদস্যের সহোদর ও ফুপাতো ভাই, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়কের স্ত্রীসহ দলীয় নেতাদের নাম থাকায় শুরু হয়েছে বিতর্ক। তালিকায় রয়েছেন জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলনে নিহত সবুজ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত এক আসামিও।
অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে সার, বীজ ও কীটনাশকের ব্যবসা করে আসা অভিজ্ঞ আবেদনকারীদেরও বাদ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠতার কারণে অনেকে লাইসেন্স পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন আবেদনকারীরা। এমনকি অর্থের বিনিময়ে ডিলারশিপ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন নেতাও। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, যোগ্যতা ও নীতিমালার ভিত্তিতে ডিলার নির্বাচন হয়েছে, নাকি রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবই ছিল মূল বিবেচ্য।
উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি সূত্রে জানা যায়, শ্রীবরদী উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার সার ডিলার নিয়োগের জন্য মোট ৮৯ জন আবেদন করেন। এর মধ্যে ১১টি স্থানের ডিলার নিয়োগের জন্য ৩২ জনের একটি সুপারিশসহ তালিকা জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির কাছে পাঠানো হয়। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান আকন্দ কমিটির সদস্যসচিব এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনীষা আহমেদ সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পরে মন্ত্রণালয় তালিকাটি অনুমোদন দেয়।
সুপারিশের তালিকা থেকে বাদ পড়া কয়েকজন আবেদনকারী অভিযোগ করেন, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, নিজস্ব গুদাম, আর্থিক সক্ষমতা ও অন্যান্য শর্ত যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। তাদের দাবি, স্থানীয় সংসদ সদস্যের পছন্দের ব্যক্তিদের নাম সুপারিশের তালিকায় স্থান পেয়েছে।
সুপারিশের তালিকায় রাণীশিমুল ইউনিয়নের ‘মেসার্স আলম ট্রেডার্স’-এর পরিচালক মো. সিদ্দিকুর রহমানের নাম রয়েছে। তিনি জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলনে নিহত সবুজ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যুবলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ছাত্র হত্যা মামলার আসামির সার ডিলার নিয়োগের তালিকায় নাম আসার পর বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের দাবি, অর্থের কাছে দলের ত্যাগী ও যোগ্য নেতাকর্মীরা বঞ্চিত হয়েছেন। তবে সিদ্দিকুর রহমানের দাবি, তিনি মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন।
অন্যদিকে, মামলার বাদী ও নিহত সবুজের বড় ভাই মো. সাদ্দাম হোসেন আদালতে নারাজি দেওয়ার পর মামলাটি বর্তমানে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে রাণীশিমুল ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি খন্দকার মো. আছলাম গত ২৪ সেপ্টেম্বর জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক বরাবর সিদ্দিকুর রহমানের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন। একই বিষয়ে গত ৪ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর অভিযোগ করেন জেলা ছাত্রদলের সভাপতি মো. নাঈম হাসান উজ্জল।
জেলা ছাত্রদলের সভাপতি মো. নাঈম হাসান উজ্জল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছর জেল-জুলুম, নির্যাতন সহ্য করে অনেক ত্যাগী কর্মী পথে বসে গেছে। অন্যদিকে সিদ্দিকুর রহমানের মতো ফ্যাসিস্টরা টাকার কুমির হয়েছে। এই সময়েও যদি তারাই অর্থের বিনিময়ে ডিলারশিপ পায়, সেটা দুঃখজনক।’
তালিকা প্রকাশের পর শ্রীবরদী পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মো. ফজলুল হক চৌধুরী অকুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেন, ‘অভিনন্দন, আমরা সর্বদলীয় লোকদের সারের ডিলার নিয়োগ দিয়েছি। জামাত বাদে।’ তার এই মন্তব্যও নিয়োগ প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে বিতর্কের প্রতিফলন হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
অনুমোদিত তালিকায় শেরপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাহমুদুল হক রুবেলের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়দের নাম থাকায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।
খড়িয়া কাজীরচর ইউনিয়নের ‘মেসার্স হক ব্রাদার্স’-এর মালিক সংসদ সদস্য মো. মাহমুদুল হক রুবেলের ছোট ভাই। কুড়িকাহনিয়া ইউনিয়নের ‘নির্মান ট্রেডার্স’-এর মো. হেদায়েতুল ইসলাম ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং সংসদ সদস্যের ফুপাতো ভাই।
অন্যদিকে, শ্রীবরদী পৌরসভার ‘মেসার্স লিখি ট্রেডার্স’-এর মাহমুদা আক্তার তারানা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. আব্দুর রহিম দুলালের স্ত্রী। কাকিলাকুড়া ইউনিয়নের জোবায়ের এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. জোবায়ের হাসান ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক। স্থানীয়ভাবে গুঞ্জন রয়েছে, উপজেলা বিএনপির এক শীর্ষ নেতা তার নামে লাইসেন্স করিয়েছেন। তবে মূলত তিনি ব্যবসার মালিক নন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া শ্রীবরদী সদর ইউনিয়নের ‘মেসার্স ইমতিয়াজ মঈন ট্রেডার্স’-এর মনি আক্তারের স্বামী সরকারি চাকরিজীবী বলে জানা গেছে।
ডিলার নিয়োগের তালিকা ঘিরে অসন্তোষ শুধু বিরোধী বা বাদ পড়া আবেদনকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; দলীয় নেতাদের একাংশও নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মীর মধ্যে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় চাপা ক্ষোভ থাকলেও তারা মুখ খুলছেন না।
সিংগাবরুণা ইউনিয়নের আবেদনকারী ও উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবু রায়হান বাবুল সরাসরি অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন। তার ভাষ্য, ‘টেহা-পয়সা কম দিবার চাইছিলাম তো, তাই আমাক দেয় নাই। আমি ১৫ লাখ দিবার চাইছিলাম। লিটন ডাবল দিছে, তাই পাইছে।’
অন্য আবেদনকারী শামসুল আরেফিন বলেন, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। যাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তার যোগ্যতা ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা কীভাবে যাচাই করা হয়েছে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন গোশাইপুর ইউনিয়নের আবেদনকারী মো. জাকির হোসেন। তিনি জানান, নিজস্ব গুদাম ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তিনি ডিলারশিপ পাননি। অথচ অন্যরা ভাড়া করা গুদাম দেখিয়েও নিয়োগ পেয়েছেন। তার বক্তব্য, ‘আসলে আমার মাল-পানি নাই, লাইসেন্স হবে কীভাবে?’
এ ছাড়া কাকিলাকুড়া ইউনিয়নের আবেদনকারী ও ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুন্নবী ফজু বলেন, ‘ব্যবসায়ী হয়েও পেলাম না। এখন যাকে দিছে সে ছোট পোলাপান, ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক। তার আর্থিক অবস্থাও ভালো না, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতাও নেই। আসলে সে তো চালাতে পারবে না, চালাবে উপজেলার আরেক নেতা।’
ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতার অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও মনিটরিং কমিটির সদস্যসচিব মো. মাহমুদুল হাসান আকন্দ বলেন, ‘প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে নীতিমালা অনুযায়ী যাচাই-বাছাই করে আগ্রহী প্রার্থীদের নাম প্রস্তাব করে জেলা কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে।’
অন্যদিকে, উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনীষা আহমেদ বলেন, ‘স্বচ্ছতার সঙ্গে সুপারিশ করা হয়েছে। এটি নিয়োগ কমিটির সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

