ময়মনসিংহে সাত মৃত্যু

এক দুর্ঘটনায় শেষ চার প্রজন্ম

এক দুর্ঘটনায় শেষ চার প্রজন্ম

গাজীপুরে নিজ বাসস্থানে ফিরবেন মোফাজ্জল হোসেন লেবু। সঙ্গে ছিলেন মা রশিদা বেগম, মেয়ে মর্জিনা বেগম ও পাঁচ বছরের নাতি মিলান। কর্মস্থলে ফিরবেন মমতা বেগমও। মায়ের কাছ থেকে নেওয়া ২ হাজার টাকা ছিল তার হাতে। স্বামী আকরাম হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে ভালুকার কর্মস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত কারো গন্তব্যে পৌঁছা হলো না। এর আগেই আকুয়া বাইপাসে ময়মনসিংহ-জামালপুর আঞ্চলিক সড়কে নিভে গেল ছয়টি জীবনপ্রদীপ।

গত শুক্রবার ময়মনসিংহে দ্রুতগতির রাজিব পরিবহনের একটি বাসের চাপায় একই পরিবারের চারজনসহ নিহত হলেন সাতজন। স্বজনদের কাছে যে যাত্রা ছিল ঘরে ফেরার বা নতুন করে কাজে ফেরার, কয়েক মুহূর্তেই তা পরিণত হলো লাশের মিছিলে।

বিজ্ঞাপন

গত বৃহস্পতিবার গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন মোফাজ্জল হোসেন লেবু (৫৫)। উদ্দেশ্য ছিল মা রশিদা বেগম (৮৫), মেয়ে মর্জিনা বেগম (২৫) ও পাঁচ বছরের নাতি মিলানকে সঙ্গে নিয়ে গাজীপুরের হোতাপাড়ার ভাড়া বাসায় ফেরা। সেখানে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণশ্রমিকের কাজ করেন তিনি।

শুক্রবার সকালে জামালপুর সদর উপজেলার দড়ি হামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামের বাড়ি থেকে মা-মেয়ে ও নাতিকে নিয়ে নান্দিনা বাজারে যান লেবু। সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ময়মনসিংহ-ঢাকা বাইপাসের দিকে রওনা হন। পরিকল্পনা ছিল, বাইপাস থেকে বাসে করে গাজীপুরে যাবেন।

কিন্তু আকুয়া বাইপাস মোড়েই থেমে যায় সেই যাত্রা। বিপরীত দিক থেকে আসা দ্রুতগতির রাজিব পরিবহনের একটি বাস অটোরিকশাটিকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই মারা যান মোফাজ্জল হোসেন লেবু, তার বৃদ্ধা মা রশিদা, মেয়ে মর্জিনা ও নাতি মিলান। স্বজনরা জানান, মর্জিনা অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।

মোফাজ্জলের ছোট ভাই মোবারক হোসেন যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তাদের এ পরিণতি। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, মা, ভাতিজি আর নাতিকে নিয়ে গাজীপুরে যাওয়ার কথা ছিল ভাইয়ের। সবাইকে নিয়ে বেড়াবে, একসঙ্গে থাকবে, এ ছিল পরিকল্পনা। কিন্তু কেউ আর গাজীপুরে পৌঁছতে পারল না। কথাগুলো বলতে বলতে বারবার থেমে যাচ্ছিলেন তিনি।

গাজীপুরের সেই ভাড়া বাসায় আর ফেরা হলো না লেবুদের। নেই মায়ের জন্য ছেলের অপেক্ষা, মেয়ের জন্য বাবার অপেক্ষা, নাতির জন্য স্বজনদের অপেক্ষা। পড়ে আছে শুধু চারটি নিথর দেহ আর স্বজনদের বুকভরা শোক।

মায়েয় কাছ থেকে টাকা নিয়ে বেরিয়েছিলেন মমতা

এদিকে শুক্রবার সকালে মায়ের কাছ থেকে ২,০০০ টাকা নিয়েছিলেন মমতা বেগম (৩৯)। সেই টাকা নিয়ে বেরিয়েছিলেন কর্মস্থলে ফিরবেন বলে। ময়মনসিংহের ভালুকার একটি গার্মেন্টসে কাজ করতেন তিনি। এক মাস আগে চাকরি ছেড়ে বাড়িতে এসেছিলেন। এবার নতুন করে কাজে যোগ দেওয়ার কথা ছিল তার।

সংসারের অভাব মেটাতে স্বামী আকরাম হোসেনও যাচ্ছিলেন তার সঙ্গে। নির্মাণশ্রমিক আকরাম ও গার্মেন্টসকর্মী মমতার আয়েই চলত দুই মেয়েকে নিয়ে তাদের ছোট্ট সংসার। কিন্তু কর্মস্থলে আর ফেরা হলো না মমতার।

জামালপুর সদর উপজেলার শরিফপুর বাজার থেকে স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ময়মনসিংহের দিকে যাচ্ছিলেন তিনি। সেখান থেকে বাসে করে ভালুকায় যাওয়ার কথা ছিল। আকুয়া বাইপাস মোড় অতিক্রমের সময় দ্রুতগতির রাজিব পরিবহনের বাস অটোরিকশাটিকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই মারা যান মমতা ও তার স্বামী আকরাম।

সকালে যে ২,০০০ টাকা হাতে নিয়ে মেয়ে কর্মস্থলের উদ্দেশে বেরিয়েছিলেন, কয়েক ঘণ্টা পর সেই মেয়েকেই নিথর অবস্থায় দেখতে হলো মা রশিদা বেগমকে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, মমতা কাজে যাবে বলে আমার কাছ থেকে ২,০০০ টাকা নিয়েছিল। শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার পথে টাকা হারিয়ে ফেলেছিল। টাকা হারানোর পর আমি যেতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু আমার কথা শোনেনি। এখন মেয়েটা বাড়িতে ফিরল, কিন্তু লাশ হয়ে।

মমতার ভাতিজা সাজ্জাদ হোসেন পাপন বলেন, চাচি ভালুকার একটি গার্মেন্টসে কাজ করতেন, চাচা নির্মাণশ্রমিক। দুজনের আয়েই সংসার চলত। এক মাস আগে চাকরি ছেড়ে বাড়িতে এসেছিলেন চাচি। নতুন করে কাজে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু আর যাওয়া হলো না।

মমতা ও আকরামের ঘরে রয়েছে দুই কন্যাসন্তান। অভাবের সংসারে একটু স্বস্তি আনতে আবার কাজে ফিরছিলেন মমতা। হাতে ছিল মায়ের কাছ থেকে নেওয়া ২,০০০ টাকা—অর্থের অঙ্কে সামান্য, কিন্তু সেই টাকার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল পরিবারের বেঁচে থাকার স্বপ্ন। সেই স্বপ্নও থেমে গেল সড়কে।

এখন দুই মেয়ের সামনে বাবা-মা দুজনকেই হারানোর শূন্যতা। আর মা রশিদার সামনে পড়ে আছে মেয়ের শেষ কথাগুলো—কাজে যাওয়ার কথা বলে যে মেয়ে সকালে ঘর থেকে বেরিয়েছিল, কয়েক ঘণ্টা পর সে ফিরেছে লাশ হয়ে।

একটি সড়ক দুর্ঘটনা শুধু ছয়টি প্রাণ কেড়ে নেয়নি; থামিয়ে দিয়েছে কয়েকটি পরিবারের স্বপ্ন, অনাথ করেছে দুই শিশুকে। সড়কে একটি মুহূর্তের বেপরোয়া গতির পরিণতি যে কত বড় হতে পারে, মোফাজ্জল, মমতা ও আকরামের ঘরের শোক যেন তারই নির্মম সাক্ষী।

এদিকে শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত পৃথক স্থানে জানাজা শেষে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়। শুক্রবার রাতে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে জামালপুর সদরের রানাগাছা ও শরিফপুর ইউনিয়নের নিজ নিজ গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়।

মোফাজ্জল হোসেন লেবু ও তার মা রশিদা বেগমের জানাজা নিজ বাড়িতে অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। আর মর্জিনা ও তার পাঁচ বছর বয়সি ছেলে মিলানের জানাজা অনুষ্ঠিত হয় মর্জিনার শ্বশুরবাড়ি রানাগাছা ইউনিয়নের ঘোড়ার কান্দা গ্রামে। জানাজা শেষে তাদেরও পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয়।

অন্যদিকে শরিফপুর ইউনিয়নের বাদেচাঁন্দি গ্রামের বাসিন্দা আকরাম হোসেন ও তার স্ত্রী মমতার লাশ শুক্রবার রাতে বাড়িতে পৌঁছে। জানাজা শেষে বাদেচাঁন্দি সামাজিক কবরস্থানে পাশাপাশি তাদের লাশ দাফন করা হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন