নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার ডিঙাপোতা হাওরের চরহাইজদা ফসলরক্ষা বাঁধ থেকে দুই হাজারের বেশি ব্লক লুটের অভিযোগ উঠেছে। গত ১৮ আগস্ট দিবাগত রাত থেকে উপজেলার গাগলাজুর ইউনিয়নের করাচাপুর গ্রামের সামনে বাঁধের বিভিন্ন স্থান থেকে এসব ব্লক নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, ওই রাতের পর থেকে প্রায় প্রতিরাতেই বাঁধের ব্লক সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ফসলরক্ষা বাঁধের ব্লক লুট হওয়ায় আতঙ্কে রয়েছেন হাওরপাড়ের কৃষকেরা। তাঁদের আশঙ্কা, বাঁধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ থেকে ব্লক সরিয়ে নেওয়া অব্যাহত থাকলে বাঁধটি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এতে আগাম বন্যা বা পানির চাপ বাড়লে হাওরের বোরো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, মোহনগঞ্জের ডিঙাপোতা হাওরের বোরো ফসল রক্ষায় ২০১৯ সালে ৩৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ে অতিঝুঁকিপূর্ণ ৫ দশমিক ৩ কিলোমিটার এলাকায় ব্লক দিয়ে স্থায়ী ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পাউবো সূত্র জানায়, গত ১৮ আগস্ট দিবাগত রাতে চরহাইজদা ফসলরক্ষা বাঁধের বিভিন্ন স্থান থেকে দুই হাজারের বেশি ব্লক নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন বিষয়টি জানাজানি হলে পাউবোর পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। তবে এরপরও ব্লক লুট বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এ ঘটনায় গত ২৩ আগস্ট মোহনগঞ্জ থানায় জিডি করেন পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী মো. এনায়েত হোসেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এর আগেও বাঁধটির কয়েকটি অংশ রাতের আঁধারে কেটে দেওয়া হয়েছিল। ওই ঘটনার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় এবার বাঁধের ব্লকও সরিয়ে নেওয়ার সাহস পেয়েছে দুর্বৃত্তরা।
এদিকে, গত ১৮ আগস্ট রাতে বাঁধের ব্লক নিয়ে যাওয়ার সময় বাধা দেওয়ার দাবি করেছেন বরান্তর গ্রামের বাসিন্দা বজলু মিয়া। তার অভিযোগ, পাশের ধরুন বাহিয়াহারী গ্রামের ২৭-২৮ জন লোক নৌকায় করে বাঁধের ব্লক নিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি বাধা দিলে তাঁকে অশালীন ভাষায় গালাগাল করা হয় এবং দেশীয় অস্ত্র দেখিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়। পরে তিনি সেখান থেকে চলে আসেন।
বজলু মিয়া আরও অভিযোগ করেন, এ ঘটনার জেরে পরদিন রাতে তাঁর মাছের আড়তে হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় তিনি থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
গাগলাজুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আশরাফ চৌধুরী বলেন, “ধরুন বাহিয়াহারী গ্রামের লোকজন রাতের আঁধারে বাঁধের এসব ব্লক নিয়ে গেছে। ওই গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে এসব ব্লক পাওয়া যাবে। থানায় অভিযোগ দেওয়ার পরও ব্লক লুট বন্ধ হয়নি। তবে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে ব্লকগুলো ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন।”
বরান্তর গ্রামের কৃষক তানিম খান আদনান বলেন, “১৮ আগস্ট দিবাগত রাত থেকে বাঁধের ব্লক লুট শুরু হয়েছে। এরপর প্রায় প্রতিরাতেই ব্লক নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়েছে এবং থানায় অভিযোগ ও জিডিও করা হয়েছে। কিন্তু পুলিশ বা প্রশাসনের দৃশ্যমান তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।”
তিনি আরও বলেন, “প্রায় দেড় মাস আগেও বাঁধের কয়েকটি স্থান রাতের আঁধারে কেটে দেওয়া হয়েছিল। তখনও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পুলিশ ও প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিলে কেউ এসব ব্লক লুট করার সাহস পেত না।”
একই গ্রামের যুবক বায়েজিদ হোসেন বলেন, “এভাবে ব্লক লুট হতে থাকলে বাঁধটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে। সামান্য বন্যাতেই হাওরের বোরো ফসল তলিয়ে যেতে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন হাওরের কৃষকেরা।” তিনি ব্লক লুটের ঘটনায় যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
মোহনগঞ্জ থানার ওসি হাফিজুল ইসলাম হারুন বলেন, “এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আগামী দুই দিনের মধ্যে লুট হওয়া ব্লকগুলো আগের জায়গায় ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। অন্যথায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা খাতুন বলেন, “পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং যারা ব্লক নিয়েছে, তাদের বাড়িতেও গিয়ে দেখা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের চিহ্নিত করা হয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ আলোচনা করে তাদের দুই-তিন দিনের মধ্যে বাঁধের যে স্থান থেকে ব্লক নেওয়া হয়েছে, সেখানে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জেলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শাখাওয়াত হোসেন বলেন, “এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বে থাকা পাউবোর কর্মকর্তা থানায় জিডি করেছেন। পাশের গ্রামের যারা ব্লক নিয়েছে, তাদের সঙ্গে পুলিশ, প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আলোচনা করেছেন। ব্লকগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।”
তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্লকগুলো যথাস্থানে ফিরিয়ে দেওয়া না হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
হাওরের কৃষকদের দাবি, শুধু ব্লক ফিরিয়ে দিলেই হবে না; বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো দ্রুত পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে সরকারি অর্থে নির্মিত ফসলরক্ষা বাঁধের উপকরণ লুট বা ক্ষতিগ্রস্ত করা না যায়, সে জন্য কার্যকর নজরদারি ও আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

