জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের টাকায় বগুড়ায় গড়ে তোলা আট মিনি কোল্ড স্টোরেজ প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে আট মাসেই। সবগুলোই এখন বন্ধের পথে।
কৃষকের উৎপাদিত সবজি সংরক্ষণ করে লোকসান ঠেকাতে পাইলট প্রকল্পের আওতায় জেলার তিন উপজেলায় স্থাপন করা হয়েছে আট সৌরশক্তিচালিত মিনি কোল্ড স্টোরেজ। কিন্তু স্থাপনের মাত্র আট মাসেই অধিকাংশই তালাবদ্ধ। চালু থাকা কয়েকটিরও ব্যবহার সীমিত। কোথাও গ্রিডের বিদ্যুৎ দিয়ে চালানো হলেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে না।
অভিযোগ উঠেছে, কৃষকের প্রকৃত প্রয়োজন বিবেচনার বদলে রাজনৈতিক প্রভাব ও সুবিধা বিবেচনায় এসব কোল্ড স্টোরেজ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ফলে কৃষকের জন্য নেওয়া প্রকল্পটি কাঙ্ক্ষিত সুফল দিতে পারছে না। রাজনৈতিক বিবেচনায় বরাদ্দের অভিযোগের বিষয়ে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে দেশে কৃষক পর্যায়ে মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে বগুড়ায় দুই ধাপে আটটি কনটেইনারভিত্তিক মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা হয়। সবজি ও আলু উৎপাদন বেশি হওয়ায় শিবগঞ্জে চারটি, গাবতলীতে তিনটি এবং সারিয়াকান্দিতে একটি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা হয়। প্রতিটি হিমাগার নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ টাকা।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল কৃষকের উৎপাদিত সবজি ৮-১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করে বাজারে সরবরাহের সময় বাড়ানো এবং অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে কৃষকের লোকসান কমানো। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ কোল্ড স্টোরেজ কৃষকের কাজে ব্যবহার হচ্ছে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোল্ড স্টোরেজগুলোর কয়েকটি পেয়েছেন রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। মহাস্থান হাটের পাশে স্থাপন করা কোল্ড স্টোরেজ পেয়েছেন শিবগঞ্জের বিএনপি নেতা তাহেরুল ইসলাম। অপরদিকে গাবতলী ও শিবগঞ্জের কয়েকটি কোল্ড স্টোরেজ প্রকল্পের প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে কৃষকের প্রয়োজন কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছেÑসে প্রশ্নও উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কৃষকদের সংগঠনের মাধ্যমে সমবায়ী ব্যবস্থাপনায় কোল্ড স্টোরেজ পরিচালনার কথা থাকলেও বাস্তবে কয়েকটি ব্যক্তি পর্যায়ে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য কৃষকের উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে।
বিএনপি নেতার কোল্ড স্টোরেজ তালাবদ্ধ
মহাস্থান হাটের একেবারে পাশে আরেকটি কনটেইনারভিত্তিক কোল্ড স্টোরেজ পেয়েছেন বিএনপি নেতা তাহেরুল। সরেজমিনে দেখা যায়, কোল্ড স্টোরেজটি তালাবদ্ধ। তাহেরুল বলেন, ‘এটা বসিয়ে দিয়ে গেছে। এরপর পটোল ও ঢ্যাঁড়শ অল্প সময়ের জন্য রেখেছিলাম। তারপর আর কিছু রাখিনি। ব্যবহার কীভাবে করতে হয়, সেটাও বুঝতে পারছি না।’
তিনি জানান, কদিন আগে প্রকল্প পরিচালকসহ কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা এসে কোল্ড স্টোরেজটি পরিদর্শন করেছেন। তাদের কাছে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে।
‘সবজি কেউ না রাখলে কী করব’
গাবতলীর বাগবাড়িতে স্থাপন করা আরেকটি কনটেইনারভিত্তিক কোল্ড স্টোরেজ পরিচালনা করছেন রেজওয়ানুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘মাঝেমধ্যে চালু করি, আবার বন্ধ রাখি। সবজি কেউ রাখতে না চাইলে কী করব?’
মোকামতলার সুজাউল ইসলামও প্রায় একই কথা বলেন। তার ভাষ্য, ‘এটা ভালো উদ্যোগ। কিন্তু কৃষকরা এখনো বিষয়টি বুঝতে পারছেন না।’
মহাস্থান হাট এলাকার অদূরে মনিতলায় স্থাপন করা একটি কোল্ড স্টোরেজ পরিচালনা করছেন লিড অ্যাগ্রো টেকের কর্ণধার রকনুল ইসলাম রোকন। সরেজমিনে দেখা যায়, কনটেইনারসদৃশ কোল্ড স্টোরেজটি চালু রয়েছে। ভেতরে সারি করে রাখা হয়েছে খালি ক্যারেট। মেঝেতে রেকসিন বিছানো। তবে কোনো সবজি সংরক্ষিত ছিল না।
কৃষিতে ডিপ্লোমাধারী রোকন বলেন, প্রায় আট মাস আগে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে কোল্ড স্টোরেজটি দেওয়া হয়েছে। প্ল্যাটফর্ম তৈরি, বিদ্যুতের তার, ক্যারেটসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম কিনতে প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হয়েছে। কোল্ড স্টোরেজটিতে সৌরবিদ্যুৎ, লিথিয়াম ব্যাটারি ও মূল গ্রিডের বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। বর্তমানে গ্রিডের বিদ্যুৎ দিয়েই এটি চালানো হচ্ছে। এতে মাসে ২২০০-৩২০০ টাকা বিদ্যুৎ বিল আসে।
কোল্ড স্টোরেজে সবজি না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কাঁচামরিচ ১৪ দিন রেখে লোকসান খেয়েছি। সরকার হঠাৎ করে আমদানি শুরু করায় দাম কমে যায়। শেষ পর্যন্ত কেনা দামের চেয়ে ১৫ টাকা কম দরে বিক্রি করেছি। বিটরুট ও লেবুও রেখেছিলাম। এখন কিছু রাখিনি।’
কৃষকদের নিয়ে সংগঠনের মাধ্যমে কোল্ড স্টোরেজ পরিচালিত হচ্ছে কি না জানতে চাইলে রোকন বলেন, ১৫ সদস্যের কমিটি রয়েছে। তবে তিনি যে দুজন সদস্যের নাম উল্লেখ করেন, তাদের একজন তার বাবা; অন্যজন তার বন্ধু।
বছরে নষ্ট লক্ষাধিক টন সবজি
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মাহফুজ আলম বলেন, এই জেলায় বছরে পাঁচ লাখ টনের বেশি সবজি উৎপাদিত হয়। সংরক্ষণের উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছর প্রায় এক লাখ ১২ হাজার ৬৫৮ টন সবজি বিক্রি না হওয়ায় পচে নষ্ট হয়। এসব সবজির বাজারমূল্য প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।
তিনি বলেন, কৃষকদের এই ক্ষতি থেকে সুরক্ষা দিতে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে দেশে ১০০টি কনটেইনারভিত্তিক মিনি হিমাগার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বগুড়ায় ইতোমধ্যে আটটি স্থাপন করা হয়েছে।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রথম অবস্থায় কিছু কিছু সমস্যা হচ্ছে। তবে সময়ের সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাবে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সোহেল মো. শামসুদ্দীন ফিরোজ বলেন, ‘যেসব অভিযোগ পেয়েছি, সেগুলো নোট রাখা হচ্ছে। কদিন আগে হিমাগার নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক এসেছিলেন। তাদেরও কিছু ফাইন্ডিংস রয়েছে। সব মিলিয়ে সমস্যাগুলো সমাধানের ব্যবস্থা করা হবে।’
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষি উৎপাদনে বাংলাদেশ অনেকটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ। এখন উৎপাদনের পাশাপাশি সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক করা জরুরি। কৃষক পর্যায়ে ছোট কোল্ড স্টোরেজ ব্যবহারের মাধ্যমে ফসলের অপচয় কমানো সম্ভব। তবে প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুফল পেতে হলে সঠিক সুবিধাভোগী নির্বাচন, প্রশিক্ষণ, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার এবং সমবায়ী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

