চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মা নদীর উজানে ভারতের ফারাক্কা ব্যারেজের ১০৯টি গেটের সব কটিই খুলে দেওয়া হয়েছে। এই ব্যারেজের মাধ্যমেই ভারতের গঙ্গা নদী থেকে পানি প্রবেশ করে বাংলাদেশের পদ্মা নদীতে। সব গেট খুলে দেওয়ায় অতিরিক্ত পানিপ্রবাহের কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এবং প্রতিদিন প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ভারতের বিহার রাজ্যের বন্যা পরিস্থিতি সামাল দিতেই ফারাক্কার সব গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, ফারাক্কা ব্যারেজের সব গেট খুলে দেওয়ার ফলে ভাটির দিকে অর্থাৎ বাংলাদেশের অভিমুখে প্রচুর পরিমাণে পানি ছাড়া হচ্ছে।
এর ফলে বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা নদীর পানি বিপৎসীমার ২৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও টানা ভারী বৃষ্টিতে জেলার চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে অন্তত ৩ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছে। এছাড়া ৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রয়েছে এবং সাড়ে ৫৬ হেক্টরের বেশি জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, গত ৭ থেকে ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাঁচ দিনে পদ্মায় ৪৪ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে। শুক্রবার সকাল ৯টায় পাঙ্খা গেজ স্টেশনে পদ্মার পানি রেকর্ড করা হয় ২১.৭৬ মিটার, যা বিপৎসীমার (২২.০৫ মিটার) মাত্র ২৯ সেন্টিমিটার নিচে।
একই দিনে মহানন্দা নদীর খালঘাট পয়েন্টে পানির সমতল রেকর্ড করা হয় ১৯.৪৩ মিটার (বিপৎসীমা ২০.৫৫ মিটার) এবং পুনর্ভবা নদীর রহনপুর পয়েন্টে ১৯.৪৬ মিটার (বিপৎসীমা ২১.৫৫ মিটার)। পাউবো জানিয়েছে, তিনটি নদীতেই পানি বৃদ্ধি পাওয়া অব্যাহত রয়েছে।
নদীগুলোর পানি বাড়ায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ২টি ও শিবগঞ্জ উপজেলার ৩টি ইউনিয়নের চরাঞ্চলের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নে ১ হাজার ও আলাতুলি ইউনিয়নে ৫০০ পরিবার এবং শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নে ১ হাজার, উজিরপুর ইউনিয়নে ২৫০ ও দুর্লভপুর ইউনিয়নে ২৫০টি পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।
পাঁকা ইউনিয়নের দুর্গম চরাঞ্চলের বাসিন্দা সুফিয়া বেগম বলেন, চারিদিকে শুধু পানি আর পানি। ঘরবাড়ি থেকে বের হওয়ার কোনো পথ নেই। গবাদিপশু আর ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে আমরা খুব বিপদের মধ্যে আছি।
পাঁকা এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন,ওই এলাকা থেকে মাত্র ১১ কিলোমিটার দুরে ফারাক্কা ব্যারেজের অবস্থান। পর্যায়ক্রমে ১০৯টি গেট খুলে দেয়ায় বন্যার সৃষ্টি হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলায়।
পাকা ইনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক বলেন,ফারাক্কা ব্যারেজের সবগুলো গেট খুলে দেয়ায় চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে চরাঞ্চলের ইউনিয়নগুলো। যে হারে পানি বাড়ছে,অব্যাহত থাকলে ক্ষতিগ্রস্থ্য হবে হাজার হাজার মানুষ। মাঠেই ডুবে নষ্ট হবে কৃষকের মাঠের ধান।
তিনি আরও বলেন,তাঁর ইউনিয়নের ৬-৭টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে এবং অন্তত সাড়ে তিনশ পরিবারের বাড়িতে পানি ঢুকে গেছে। আপাতত পানি বৃদ্ধি স্থগিত থাকলেও সামনে বন্যা বড় রূপ নিতে পারে বলে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
শিবগঞ্জ উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ ও নির্দেশনা পেলেই দুর্গতদের মাঝে সহায়তা কার্যক্রম শুরু করা হবে।
বন্যার কারণে সদর উপজেলার ২টি ও শিবগঞ্জ উপজেলার ৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পানি ঢুকে পড়ায় সেগুলোতে সাময়িক পাঠদান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানান জেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুর রাজ্জাক।
অন্যদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আতিকুল ইসলাম জানান, জেলার ৫টি উপজেলায় ৫৬.৫ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩১.৫ হেক্টর মাসকলাই, ১৪.২ হেক্টর শাকসবজি, ৪ হেক্টর রোপা আমন, ৩.৪ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বীজতলাসহ আউশ ধান ও হলুদ রয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

