জমির বিরোধ, পারিবারিক কলহ কিংবা সামান্য কথাকাটাকাটির মতো বিরোধের পরিণতি গড়াচ্ছে হত্যাকাণ্ডে। কখনো কিস্তির টাকা, কখনো রিকশা ভাড়া আবার কখনো ভাঙতি টাকা না দেওয়াকে কেন্দ্র করেও প্রাণঘাতী সহিংসতার ঘটনা ঘটছে রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলায়। চলতি বছরের ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত সাড়ে ৯ মাসে বিভাগজুড়ে ২৪৯টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত করেছে পুলিশ। একের পর এক এমন ঘটনায় জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি বিরোধ নিষ্পত্তি ও অপরাধ প্রতিরোধের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
রাজশাহী রেঞ্জ পুলিশের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে বিভাগের আট জেলায় ২৩৩টি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে। অক্টোবরের প্রথম ১৫ দিনের আরো ১৬টি মামলা যুক্ত হলে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ২৪৯-এ। রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও জয়পুরহাটে এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
রাজশাহী মহানগরী ও আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত ১১ অক্টোবর নগরীর কেদুর মোড় এলাকা থেকে ৭০ বছর বয়সি এক নারীর রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। একই রাতে পবা উপজেলার খড়খড়ি কমলাপুর এলাকায় জমি নিয়ে বিরোধের জেরে এক বাঁশ ব্যবসায়ীকে হত্যার অভিযোগ ওঠে।
এর আগে মার্চে রাজশাহীর কর্ণহার থানা এলাকায় শিশু আদিব আহনাফকে পাশের একটি ঘাসের জমিতে নিয়ে হত্যা করে ১৪ বছর বয়সি আরেক শিশু। ১১ আগস্ট জমি নিয়ে বিরোধের জেরে বেলপুকুর এলাকার আবদুল করিমকে হত্যা করা হয়। পরদিন রিকশাচালক পলাশের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে তদন্তে রিকশা ভাড়াকে কেন্দ্র করে কয়েকজন কিশোরের হাতে তার হত্যার ঘটনা সামনে আসে।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর বাঘা উপজেলায় কিস্তির টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে স্বামীর হাতে খুন হন জুসি বেগম। ২৪ সেপ্টেম্বর মোহনপুরে কথাকাটাকাটির জেরে ছেলের হাতে হত্যার শিকার হন এক নারী। একই মাসের ২৬ তারিখ নগরীর লক্ষ্মীপুর এলাকায় টাকা ভাঙতি না দেওয়াকে কেন্দ্র করে মুদি দোকানি আবদুল বারীকে হত্যা করা হয়।
বিভিন্ন ঘটনার বিবরণে জমিজমা নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, পূর্বশত্রুতা এবং তাৎক্ষণিক সংঘর্ষের মতো কারণ উঠে এসেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামান্য বিরোধও শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে।
অধিকাংশ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি পুলিশের
রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র গাজিউর রহমান বলেন, রাজশাহীর অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার এবং ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়েছে।
রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি আশিক সাঈদ বলেন, বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ড
রাজশাহী বিভাগে সাড়ে ৯ মাসে ২৪৯ হত্যা মামলা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ঘটছে। এতে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা নেই। যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, সেগুলোয় পুলিশ তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়েছে।
আর্থসামাজিক সংকট ও অসহিষ্ণুতার প্রভাব
জমিজমা ও তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের পেছনে একাধিক আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ রয়েছে বলে মনে করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক একেএম মাহমুদুল হক টুটুল।
তিনি বলেন, মানুষের আর্থিক অনটন এবং প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার ফলে সৃষ্ট হতাশা ও মানসিক অস্থিরতা পারিবারিক বিরোধের অন্যতম কারণ। পাশাপাশি নৈতিকতার অবক্ষয়, পারস্পরিক সম্প্রীতি ও শ্রদ্ধাবোধের ঘাটতি সহিংসতা বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি না হওয়া, রাজনৈতিক বিভাজন, পরমত-অসহিষ্ণুতা ও প্রতিশোধপরায়ণতা সংকট আরো গভীর করছে।
অধ্যাপক টুটুল বলেন, সমাজে ‘সামাজিক পুঁজি’ গঠনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, আত্মমূল্যবোধ, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতি বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখা এবং বিরোধের সুষ্ঠু মীমাংসায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। রাজনৈতিক বিদ্বেষ ও সহিংস বিভেদ দূর করে পারস্পরিক সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠা করা গেলে সমাজকে এ ধরনের সহিংসতা থেকে মুক্ত করার পথ সুগম হবে।
অপরাধ প্রতিরোধে সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু মামলা দায়ের ও গ্রেপ্তারের পরিসংখ্যান দিয়ে পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। হত্যাকাণ্ডের ধরন, বিরোধের পূর্বাপর পরিস্থিতি, অপরাধ সংঘটনের কারণ এবং তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। জমি নিয়ে বিরোধে দ্রুত আইনি প্রতিকার, পারিবারিক দ্বন্দ্বের কার্যকর নিষ্পত্তি এবং সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দিলে দ্রুত পুলিশি হস্তক্ষেপ প্রাণহানি ঠেকাতে সহায়ক হতে পারে।
তবে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগ যেন আইনি প্রতিকারের বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করাও জরুরি। অভিযোগ গ্রহণ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিতের পাশাপাশি কোন ধরনের বিরোধ সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির কারণ হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

