উদ্বোধনের আগেই ‘মৃত’ বগুড়ার বার্ন ইউনিট

উদ্বোধনের আগেই ‘মৃত’ বগুড়ার বার্ন ইউনিট

ছয় বছর আগে প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ শেষ হলেও চালু হয়নি বগুড়ার ১০ শয্যার বার্ন ইউনিট। প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম না থাকায় এত দিন তালাবদ্ধ পড়ে থাকা ইউনিটটি এবার অগ্নিদগ্ধ রোগীদের চিকিৎসার জন্য না খুলে আইসিইউ ও সিসিইউ হিসেবে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে বগুড়া ও উত্তরাঞ্চলের অগ্নিদগ্ধ রোগীদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রত্যাশা আরো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

চলতি বছরের মার্চে কাহালুর সাকোহালী গ্রামের দুবছরের শিশু রাইসা আক্তার দিয়াশলাই নিয়ে খেলতে গিয়ে আগুনে দগ্ধ হয়। একইভাবে বগুড়া শহরের মালগ্রাম এলাকায় পারিবারিক বিষয়ে অভিমান করে অনার্স পড়ুয়া এমরান গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেন। দুজনকেই উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিতে হয়। স্থানীয়ভাবে বার্ন ইউনিট না থাকায় এ ধরনের গুরুতর রোগীদের প্রায়ই ঢাকায় পাঠাতে হয় বলে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। তারা বগুড়ার বার্ন ইউনিটটি চালুর দাবি জানিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

চার কোটি টাকার বার্ন ইউনিট চালু হয়নি ছয় বছরেও

বগুড়ার ২৫০ শয্যার মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল চত্বরে অগ্নিদগ্ধ রোগীদের চিকিৎসার জন্য ১০ শয্যার বার্ন ইউনিট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১৫ সালে। ২০১৭ সালে প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার পর গণপূর্ত বিভাগ দরপত্র আহ্বান করে। ঠিকাদারের মাধ্যমে ২০১৮ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ২০১৯ সালের অক্টোবরে। এতে ব্যয় হয় প্রায় তিন কোটি ৬৪ লাখ টাকা।

নির্মাণ শেষে গণপূর্ত বিভাগ ইউনিটটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে। সেখানে দুটি বিশেষায়িত ওয়ার্ড, অস্ত্রোপচার কক্ষ, পর্যবেক্ষণ ইউনিট, চিকিৎসকদের চেম্বার ও বিশ্রামকক্ষসহ বিভিন্ন সুবিধা রাখা হয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম না থাকায় ইউনিটটি চালু করা হয়নি; তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে।

প্রয়োজনীয় জনবল হলেই চালু হতো বার্ন ইউনিট

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, বার্ন ইউনিট চালুর জন্য একজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট, দুজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট, দুজন সহকারী রেজিস্ট্রার, চারজন ইনডোর মেডিকেল অফিসার, চারজন মেডিকেল অফিসার, দুজন অ্যানেসথেটিস্ট, ১৬ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স, ১২ জন অফিস সহায়ক, ১২ জন ওয়ার্ডবয় ও আটজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী প্রয়োজন।

কিন্তু এসব পদ সৃষ্টি বা পদায়ন করা হয়নি। একইসঙ্গে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামও বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ইউনিটটি চালুর জন্য চিকিৎসক, নার্সসহ প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জাম চেয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একাধিকবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে। সবশেষ গত ২ আগস্টও এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়।

বার্ন ইউনিটের বদলে আইসিইউ-সিসিইউ

গত ১৯ আগস্ট বগুড়া সফরে এসে মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের বার্ন ইউনিট পরিদর্শন করেন স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, পরিদর্শনের পর তিনি জানান, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে পৃথক বার্ন ইউনিট চালু করা সম্ভব নয়। বিদ্যমান অবকাঠামোটি আইসিইউ ও সিসিইউ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

এরপর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী বার্ন ইউনিটটি বিলুপ্ত করে সেখানে আইসিইউ ও সিসিইউ চালুর প্রক্রিয়া শুরু করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ফলে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বিশেষায়িত বার্ন ইউনিটটি অগ্নিদগ্ধ রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহারের আগেই অন্য কাজে রূপান্তরিত হচ্ছে।

তিন বছরে ৩৮৯ অগ্নিদগ্ধ রোগী

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত তিন বছরে বগুড়ার দুটি সরকারি হাসপাতালে আগুনে পোড়া ৩৮৯ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে উন্নত চিকিৎসার জন্য ৩৮ জনকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে।

বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে পৃথক বার্ন ইউনিট না থাকায় সার্জারি বিভাগসহ সাধারণ ব্যবস্থাপনাতেই এসব রোগীর চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

চিঠি দিয়েও মেলেনি জনবল

২৫০ শয্যার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মজিদুল ইসলাম বলেন, ভবন বুঝে নেওয়ার পর থেকেই বার্ন ইউনিট চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং মন্ত্রণালয়ে কয়েক দফা চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর পদ সৃষ্টি হয়নি এবং কোনো যন্ত্রপাতিও বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, সবশেষ চিঠিতেও ইউনিটটি চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জাম চাওয়া হয়েছিল। তবে স্বাস্থ্য সচিব পরিদর্শনে এসে এটি বার্ন ইউনিট হিসেবে চালু না করে আইসিইউ ও সিসিইউ হিসেবে ব্যবহারের কথা বলেছেন।

বগুড়ায় বার্ন ইউনিট চান ভুক্তভোগীরা

কাহালুর সাকোহালী গ্রামের রাইসার বাবা রবিউল ইসলাম, বগুড়া শহরের মালগ্রামের অগ্নিদগ্ধ এমরানের মা কল্পনাসহ স্থানীয় বাসিন্দারা বগুড়ায় বার্ন ইউনিট চালুর দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিবছর অগ্নিদগ্ধ রোগীরা বগুড়ায় চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু এখানে বিশেষায়িত বার্ন ইউনিট না থাকায় গুরুতর রোগীদের ঢাকায় পাঠাতে হয়।

বগুড়ার সুশাসনের জন্য প্রশাসনের (সুপ্র) কেজিএম ফারুখ, শহর বিএনপির সভাপতি হামিদুল হক চৌধুরী হিরু এবং সমাজকর্মী-সাংবাদিক ফজলে রাব্বি ডলারও বগুড়ায় বার্ন ইউনিট চালুর প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন।

তাদের মতে, কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি বিশেষায়িত ইউনিট ছয় বছর অব্যবহৃত থাকার পর সেটিকে আইসিইউ ও সিসিইউতে রূপান্তরের উদ্যোগ স্বাস্থ্য অবকাঠামো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...