রাজশাহী-চাঁপাই মহাসড়কে আতঙ্কের নাম বালুবাহী ডাম্প ট্রাক

রাজশাহী-চাঁপাই মহাসড়কে আতঙ্কের নাম বালুবাহী ডাম্প ট্রাক
ছবি: সংগৃহীত

রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কগুলোতে বেপরোয়া গতিতে চলাচলকারী বালু ও মাটিবোঝাই ড্রাম ট্রাক বা ডাম্প ট্রাক বর্তমানে জননিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি ও আতঙ্কের নাম। অপ্রাপ্তবয়স্ক বা অদক্ষ চালকরা এসব ভারী যানবাহন চালালেও কার্যকর ট্রাফিক নজরদারি নেই। এছাড়া পদ্মা নদী থেকে বৈধ ও অবৈধভাবে বালু তোলা হচ্ছে। নদী থেকে বালু উত্তোলনেও মানা হচ্ছে না কোনো নীতিমালা। ফলে নদীর তীররক্ষা বাঁধ রয়েছে হুমকির মুখে। সেই বালু জেলার ভেতরসহ আশপাশের জেলাগুলোতে সরবরাহ করা হচ্ছে। ডাম্প ট্রাক ছাড়াও ট্রাক ও ট্রাক্টরে অতিরিক্ত বালু বোঝাই করে, বেপরোয়া গতিতে ও খোলা অবস্থায় বালু নিয়ে যাওয়ায় প্রায়ই ঘটছে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা, প্রতিবছর ঝরছে বহু মানুষের প্রাণ। এলাকাবাসী ট্রাকগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দিলেও রহস্যজনক কারণে নীরব থাকছে প্রশাসন। সড়ক বিভাগ বলছে, এক্সেল লোড মেশিন স্থাপনের কাজ শেষ হলেই ট্রাকগুলো নিয়ন্ত্রণে আসবে।

বিজ্ঞাপন

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গোদাগাড়ীর পদ্মার বালুঘাটগুলো থেকে দিনরাত বালু এবং নদীর পাড় থেকে মাটি কেটে বিক্রি করছে বালু মাফিয়ারা। একেকটি ট্রাকে ৩০ থেকে ৪০ টন করে বালু ও মাটি বহন করা হচ্ছে। অথচ এসব সড়কের সর্বোচ্চ ভারবহন ক্ষমতা ১৫ থেকে ২০ টন। অন্যদিকে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর প্রেমতলী ও ফুলতলা বালুঘাট থেকে তোলা বালু দিনরাত বেপরোয়া গতিতে দাপিয়ে চলা, ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বালুবোঝাই শত শত ডাম্প ট্রাকে বহনের ফলে রাজশাহী-চাঁপাই মহাসড়ক ও বিজয়নগর-উজানপাড়া ভিতরপাশ পিচঢালা সড়ক এবং গ্রামীণ রাস্তাগুলো অল্প সময়েই ভেঙে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। এসব সড়ক দিয়ে বালুবাহী ভারী ডাম্প ট্রাক চলাচলের কারণে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা সড়কগুলো ভেঙে যাচ্ছে। এলাকাবাসী কয়েকবার বিক্ষোভ করলেও বালু মাফিয়াদের প্রভাবের কারণে প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

সরেজমিনে দেখা যায়, গোদাগাড়ী উপজেলার সেখেড়পাড়া, ভাটোপাড়া, ফুলতলা, সারেংপুর, সুলতানগঞ্জ, গাঙ্গবাড়ীসহ বিভিন্ন পয়েন্টে পদ্মা নদী থেকে বালু উত্তোলন করে ডাম্প ট্রাক, ট্রাক ও ট্রাক্টরে করে নেওয়া হচ্ছে। বেপরোয়া গতিতে এবং নামমাত্র পর্দা দিয়ে বালু ঢেকে নিয়ে যাওয়ায় ডাম্প ট্রাক থেকে বালু উড়ে এসে পথচারী, স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী, মোটরসাইকেল চালক ও সব ধরনের যানবাহনের চালকদের চোখে-মুখে পড়ায় বাড়ছে দুর্ঘটনা, ঝরছে প্রাণ। সড়কের পাশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার থাকায় ট্রাকের কারণে সড়কে চলাচলকারীরাও থাকেন চরম আতঙ্কে। হর্ন, ধুলাবালি আর কালো ধোঁয়ায় নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ, সেই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সড়ক। শুধু তাই নয়, বালু ও ধুলোর কারণে শ্বাসরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে।

সেখেড়পাড়ার স্থানীয় বাসিন্দা আল-আমিন বলেন, প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে শত শত ডাম্প ট্রাক চলাচল করে। কোনো নিয়ম মানে না এরা। বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালায়। এতে অনেকেই প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনায় পড়ছেন।

নাচোলগামী মোটরসাইকেল আরোহী শরীফ বলেন, চোখ-মুখ ধুলায় ভরে যায়, কিন্তু কিছু করার থাকে না। একদিকে বাতাস, অন্যদিকে বেপরোয়া গতির গাড়িতে দুর্ভোগের শেষ নেই। প্রশাসনের পদক্ষেপ কামনা করছি।

অটোচালক দুলাল বলেন, এ সড়কে গাড়ি চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। কিছুদিন ধরে সড়কে বালুবাহী গাড়ির বেপরোয়া গতি আর বালু উড়ে চোখে-মুখে পড়ছে। এতে যাত্রী ও আমাদের অনেক সমস্যা হয়।

ভাটোপাড়া গ্রামের বাসিন্দা তোফাজ্জল জানান, ডাম্প ট্রাকগুলো থেকে অনবরত ধুলাবালি উড়ে চারপাশের বাতাস ও পরিবেশ দূষিত করছে, যা পথচারী ও আশপাশের বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যহানি ঘটাচ্ছে। বালু উড়ে ঘরে ঢুকে। জানালা-দরজা সব সময় বন্ধ রাখতে হয়। বাইরে ভেজা কাপড় শুকানো যায় না বালুর কারণে। আমরা অভিভাবকরা সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতে পারি না। কখন দুর্ঘটনা ঘটে, সেই আতঙ্কে থাকি।

এ ব্যাপারে গোদাগাড়ী উপজেলা নাগরিক স্বার্থ রক্ষা কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালাউদ্দিন বিশ্বাস বলেন, বেপরোয়া ডাম্প ট্রাকগুলো এভাবে বালু বহন করা হলে মানুষের দুর্ভোগের শেষ থাকে না। এগুলোর ওপর প্রশাসনের নজরদারি থাকা উচিত। তবে মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ—এমনটাই প্রত্যাশা করেন তিনি।

রাজশাহী বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, বালুবাহী ট্রাকের বেপরোয়া চলাচলের কারণে রাজশাহী-চাঁপাই মহাসড়কে বছরে শতাধিক মানুষের প্রাণ ঝরছে। সড়ক দুর্ঘটনার বড় কারণ যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল। যানবাহন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের। বালুবাহী ডাম্প ট্রাকের দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে বলে বিআরটিএ সূত্র জানিয়েছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান বলেন, সড়কগুলোতে দুর্ঘটনা বাড়ার পাশাপাশি বালুবাহী ট্রাকের কারণে সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বালু ও মাটিবাহী ট্রাকসহ বিপুলসংখ্যক অপ্রচলিত যানবাহন জেলার সড়কগুলো দিয়ে চলাচল করে। রাজশাহী-চাঁপাই মহাসড়ক ঘেঁষে তৈরি হয়েছে অনেক ইটভাটা। এসব ইটভাটায় বালু ও মাটি যথেষ্ট পরিমাণে বহন করা হচ্ছে। বালু ও মাটি বহনের সময় তা ঢেকে রাখা হয় না। ট্রাক থেকে বালু ও কাদামাটি সড়কে ছড়িয়ে পড়ে সড়ক পিচ্ছিল হয়ে যায়। এতে সড়কে যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে। এতে একদিকে যেমন সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে, তেমনি কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা সড়কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গোদাগাড়ী ট্রাফিক সার্জেন্ট আমির হামজা বলেন, ইদানীং ডাম্প ট্রাকের দৌরাত্ম্য কিছুটা বেড়েছে। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করলে বা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালালে ট্রাফিক বিভাগ নিয়মিত যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা করে। এছাড়াও ডাম্প ট্রাকের চালক ও মালিকদের ট্রাফিক আইন এবং গতিসীমা কঠোরভাবে মেনে চলে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে পুলিশকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান। এছাড়া খোলা অবস্থায় বালু পরিবহন করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এর ব্যতিক্রম হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন