রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে মাদকবিরোধী অভিযান ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাতটি মাদক মামলার আসামি ৩০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আবুল কালাম আজাদকে সম্প্রতি তার স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে গোদাগাড়ী মডেল থানায় ওসির সঙ্গে দেখা করতে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে—এমন একটি ছবি ও তথ্য এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে গোদাগাড়ী পৌর এলাকার মহিশালবাড়ী সাগরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ তার স্ত্রী আরমিনা আক্তারকে সঙ্গে নিয়ে গোদাগাড়ী মডেল থানায় যান। ওই সময় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান উপস্থিত না থাকায় আবুল কালামকে ওসির কক্ষে বসে অপেক্ষা করতে এবং তার স্ত্রীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় বলে সূত্রটি জানায়।
এদিকে, গত ২৩ জুন গোদাগাড়ীতে মাদকবিরোধী সমাবেশ ও কমিউনিটি পুলিশিং সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপজেলার মাদক সমস্যা ও চিহ্নিত মাদক কারবারিদের বিষয়ে আলোচনা হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, সভা ও মাদকবিরোধী কর্মসূচি চললেও মাঠ পর্যায়ে পুলিশের অভিযান তেমন জোরালো নয়। গত কয়েক দিন ধরে মাদকবিরোধী অভিযান কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে বলেও একাধিক সূত্র দাবি করেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চিহ্নিত মাদক কারবারিদের কেউ কেউ থানায় যাতায়াত করছেন এবং পুলিশের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। এমনকি মাদকবিরোধী সমাবেশের আগে তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি জাহাঙ্গীর আলম থানায় গিয়ে ওসির সঙ্গে দেখা করেছেন এবং তাকে বিশেষভাবে ওসির টেবিলে আপ্যায়ন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন গোদাগাড়ী মডেল থানার ওসি আতিকুর রহমান। তিনি বলেন, চলিত বছর এপ্রিলে তিনি থানায় যোগ দিয়েছেন। থানার সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষিত আছে। কারও অভিযোগ থাকলে ফুটেজ যাচাই করে দেখার আহ্বান জানান তিনি। জাহাঙ্গীর আলমের থানায় যাওয়া বা তাকে আপ্যায়নের অভিযোগও অস্বীকার করেন ওসি।
এদিকে, মাদকবিরোধী অভিযানের তথ্য ফাঁস এবং মাদক কারবারিদের সঙ্গে পুলিশের যোগসাজশের অভিযোগও উঠেছে থানার এসআই সোহেল ও রাজিবের বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, মাদক ব্যবসায়ীদের বিষয়ে পুলিশকে দেওয়া তথ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছে যায়।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে এসআই সোহেল বলেন, তিনি এই থানায় মাত্র এক মাস আগে যোগ দিয়েছেন। এলাকার রাস্তাঘাট ও মাদক কারবারিদেরও ঠিকমতো চেনেন না। ফলে এমন অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। এর আগে গত ১১ জুলাই আবুল কালাম আজাদকে নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে তিনি গ্রেপ্তার এড়াতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্র দাবি করেছে।
এ বিষয়ে আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি উত্তেজিত হয়ে অশালীন ভাষায় গালগাল করেন এবং প্রতিবেদককে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এদিকে নিউজ প্রকাশের জেরে কালামের স্ত্রী আরমিনা আক্তারও প্রতিনিধিকে গালাগাল ও হুমকি দেন।
কালামের সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন: নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাগরপাড়া গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেন, একসময় নিম্ন আয়ের পরিবার থেকে উঠে এলেও বর্তমানে আব্দুল কালাম আজাদের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ রয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সে মাদকের ব্যবসা করে। বর্তমানে তার চলাফেরা রাজার মতো।
এই ব্যবসা করে সাহাব্দীপুর এলাকায় মা ব্রিকস্ নামে একটি ইটভাটা, জলাহার মৌজায় ৪ বিঘা কৃষিজমি, এছাড়া একটি পুরাতন বাড়িসহ মাটি ক্রয়, জোতজয়রাম মৌজায় ২১৯ দাগে ৮৩ শতক জমি, মহিশালবাড়ি-সাগরপাড়া এলাকায় পৈতৃক ভিটায় আনুমানিক আর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে নতুন বাড়ি নির্মাণ করছেন। মহিশালবাড়ী গোরস্থান মার্কেটে ২৬ লাখ টাকায় দুটি দোকান কেনেন। দুটি এফ-জেড ব্যান্ডের দামি মোটরসাইকেল এবং ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট আছে বলে এলাকায় প্রচলিত রয়েছে। আছে নামে-বেনামে নগদ ক্যাশ আনুমানিক ৫ কোটি টাকা। তবে এসব সম্পদের মালিকানা ও অর্থের উৎস সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।
গোদাগাড়ী নাগরিক স্বার্থ-সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি এডভকেট সালাউদ্দীন বিশ্বাস বলেন, মাদক ব্যবসা অত্যন্ত লাভজনক হওয়ায় এর সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের যোগসাজশের অভিযোগ পাওয়া যায়। মাদকবিরোধী অভিযান ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি প্রশংসনীয় হলেও এসব কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো পুলিশ সদস্য বা অন্য কেউ মাদক কারবারিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলে কঠোর তদন্তের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
সচেতন মহলের দাবি, মাদক মামলার আসামি ও সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের থানায় যাতায়াত, পুলিশের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ এবং মাদকবিরোধী অভিযানে কোনো ধরনের গাফিলতি বা তথ্য ফাঁসের অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গোদাগাড়ীতে মাদকবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করে প্রকৃত মাদক কারবারিদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

