রাজশাহীতে সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকলেও সময়মতো পাচ্ছেন না কৃষক। সারের জন্য মাঠপর্যায়ে কৃষকদের মধ্যে হাহাকার দেখা যাচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও সার পাচ্ছেন না তারা।
সরকারি গুদামে সারের মজুত চাহিদার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। বিভাগীয় প্রশাসন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরও বলছে, জেলায় সারের কোনো সংকট নেই। কৃষকদের চাহিদা মেটাতে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। এমনকি কোনো কোনো সারের মজুত চলতি মাসের বরাদ্দের কয়েকগুণ বেশি।
কিন্তু মাঠের চিত্র ভিন্ন। সারের জন্য কৃষকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও সার না পেয়ে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটছে। আবার বেশি দাম দিলে সার পাওয়া যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এরই মধ্যে গোদাগাড়ীতে এক ডিলারের গুদাম থেকে ৮১৭ বস্তা সার উদ্ধারের ঘটনায় প্রশ্ন আরো জোরালো হয়েছে। কৃষকদের প্রশ্ন—গুদামে যদি পর্যাপ্ত সার থাকে, বরাদ্দও যদি চাহিদার চেয়ে বেশি থাকে, তাহলে কৃষকের হাতে সার পৌঁছাচ্ছে না কেন, এই সার যাচ্ছে কোথায়?
সম্প্রতি পুঠিয়ায় সারের জন্য মহাসড়ক অবরোধ করেন কৃষকরা। তাদের অভিযোগ, আমন ধানের জমিতে সার প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ডিলারের দোকানে প্রয়োজনীয় সার পাওয়া যাচ্ছে না। ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে সার না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
ঝলমলিয়া গ্রামের কৃষক আব্দুল আওয়াল বলেন, তিন দিন ধরে বাজারে ঘুরেও ডিলারের কাছ থেকে সার পাইনি। অথচ বেশি টাকা দিলে খুচরা বাজারে সার পাওয়া যাচ্ছে।
কৃষক নরেন কর্মকারের অভিযোগ, ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও সার পাইনি। ধানের জমিতে এখন সার না দিলে ফলন কমে যাবে। গুদামে যদি সার থাকে, তাহলে আমাদের কাছে আসে না কেন?
আরেক কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, সকাল ৬টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ১০টার দিকে বলা হয় সার শেষ। আমাদের প্রশ্ন—সরকারি বরাদ্দের সার কোথায় যাচ্ছে?
নগরীর নওদাপাড়া এলাকায় বিএডিসির সার গুদাম পরিদর্শন শেষে মঙ্গলবার বিভাগীয় কমিশনার ইউসুফ আলী জানিয়েছেন, রাজশাহীতে সারের কোনো সংকট নেই। তার দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বিসিআইসির বাফার গুদামে ৯,৮০৪ টন ইউরিয়া, ৪৩০ টন টিএসপি এবং ৮৫ টন ডিএপি মজুত রয়েছে। অন্যদিকে বিএডিসির গুদামে রয়েছে ৬,৩১২ টন টিএসপি, ৮০১ টন এমওপি এবং ৪,৩৪৮ টন ডিএপি।
বিভাগীয় কমিশনার জানান, চলতি মাসে রাজশাহী জেলায় টিএসপির বরাদ্দ ১,০৪৫ টন। এর বিপরীতে শুধু বিএডিসির গুদামেই রয়েছে ৬,৩০০ টন। ইউরিয়ার মাসিক বরাদ্দ ৫,৭০০ টন হলেও বিসিআইসি বাফার গুদামেই রয়েছে প্রায় ১০ হাজার টন।
তিনি বলেন, সারের কোনো ক্রাইসিস নেই। গুদামে পর্যাপ্ত সার আছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ অনুযায়ী নিয়মিতভাবে ডিলারদের কাছে সার সরবরাহ করা হচ্ছে। ডিলাররা ওই সার দোকানে বিক্রি করছেন।
ডিলারের গুদামেই ৮১৭ বস্তা
সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত সার থাকার দাবির মধ্যেই গোদাগাড়ীতে ডিলারের গুদাম থেকে ৮১৭ বস্তা সার উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত দুই দফা অভিযান চালিয়ে মেসার্স কৃষি ঘর নামের সার ডিলারের গুদাম থেকে ৬১৬ বস্তা এমওপি ও ২০১ বস্তা টিএসপি উদ্ধার করা হয়। অবৈধভাবে সার মজুতের অভিযোগে ডিলার সোলাইমান পাটোয়ারীকে এক মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, সোলাইমান বিসিআইসি ও বিএডিসির সার ডিলার। সার মজুত ও বিক্রির বিষয়ে গত দুই মাসে তাকে তিনবার সতর্ক করা হয়েছিল। এরপরও নিয়ম না মেনে বিপুল সার গুদামে মজুত রাখায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইসরাত জাহান বলেন, কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে ডিলারদের গুদাম ও বিক্রয় কেন্দ্রে অভিযান ও তদারকি করা হচ্ছে। কেউ অবৈধভাবে সার মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বা কৃষকদের হয়রানি করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কৃষকদের অভিযোগ, অনেক সময় ডিলারের দোকানে সার না থাকলেও একই এলাকার অন্য দোকানে বাড়তি দামে সার পাওয়া যায়। ফলে সরকারি বরাদ্দের সার খুচরা বাজারে কীভাবে যাচ্ছে, সেটিও তদন্তের দাবি রাখে।
বিশেষজ্ঞের মতে, শুধু সরকারি গুদামে কত টন সার রয়েছে, সে হিসাব দিয়ে বাজার পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব নয়। গুদাম থেকে ডিলার এবং ডিলার থেকে কৃষকের হাতে সার পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের হিসাব মিলিয়ে দেখতে হবে।
গুদামে থাকলেও কৃষক পাচ্ছেন না
রাজশাহীর সারের বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই। সরকারি হিসাবে গুদামে চাহিদার চেয়ে কয়েকগুণ সার রয়েছে। বিভাগীয় প্রশাসন বলছে, সংকট নেই। কৃষি বিভাগও পর্যাপ্ত মজুতের কথা জানাচ্ছে।
অন্যদিকে কৃষক সার না পেয়ে রাস্তায় নামছেন। তাই এখন শুধু গুদামে কত সার রয়েছে, সে হিসাব প্রকাশ করলেই হবে না। কোন ডিলার কত সার বরাদ্দ পেয়েছেন, কত সার উত্তোলন করেছেন, কতটা বিক্রি করেছেন, কার কাছে বিক্রি করেছেন এবং বর্তমানে তার গুদামে কত সার রয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ ও নিয়মিত যাচাই করা জরুরি।
একই সঙ্গে যেসব এলাকায় কৃষক সড়ক অবরোধ করেছেন, সেসব এলাকার বরাদ্দ, ডিলারদের উত্তোলন ও বিক্রির হিসাব এবং কৃষকের প্রকৃত চাহিদা পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। কারণ, সারের সংকটের প্রকৃত চিত্র গুদামের মজুত দিয়ে নয়; প্রয়োজনের সময় কৃষকের হাতে নির্ধারিত দামে সার পৌঁছাচ্ছে কি না, সে হিসাবেই পরিষ্কার হবে। আর সে হিসাবই এখন রাজশাহীর কৃষকদের সবচেয়ে বড় প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে—গুদামে পর্যাপ্ত সার থাকার পরও সার যাচ্ছে কোথায়?
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

