পদ্মা, যমুনা ও সুরমা নদীতে ভাঙন ভিটেমাটি হারিয়ে দিশাহারা মানুষ

আমার দেশ ডেস্ক

পদ্মা, যমুনা ও সুরমা নদীতে ভাঙন ভিটেমাটি হারিয়ে দিশাহারা মানুষ

যমুনা, পদ্মা ও সুরমা নদীতে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিয়েছে ভাঙন। নদীভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ভিটেমাটি, ফসলি জমি, স্কুল, মাদরাসা, মসজিদ, কলেজসহ নানা স্থাপনা। অনেক স্থানে নদীভাঙন রোধে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ও টিউব ফেলে ভাঙন রোধ করা যাচ্ছে না । এতে করে নদীভাঙনের শিকার মানুষ দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জে সুরমা নদীতে দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। গত কয়েকদিনে গ্রামীণ সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। শান্তিগঞ্জ উপজেলার তিন গ্রামের শত শত মানুষ ভাঙনের কবলে পড়ে দিশাহারা হয়ে গেছেন। অনেক আগেই নদীতে বিলীন হয়ে গেছে মসজিদ ও বিদ্যালয়। অসংখ্য পরিবারের বাড়িঘর বিলীন হয়ে গেছে। সুরমার ভাঙন ঠেকানোর উদ্যোগ না নেওয়ায় নদীপাড়ের শত শত পরিবার চরম আতঙ্কে আছেন।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সুরমার ভাঙনে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। শত শত পরিবার ভাঙন আতঙ্কে রাত কাটছেন। গ্রামের মসজিদ, স্কুল ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে অনেক আগে।

ইউপি সদস্য আব্দুল মছাব্বির বলেন, গত ২০ বছর ধরে সুরমা নদীভাঙন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। শত শত পরিবার ভাঙন আতঙ্গে রয়েছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এমদাদুল হক জানান, এ এলাকার যেসব স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে, সেখানে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরবর্তীতে নদীভাঙন ঠেকাতে স্থায়ী প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।

সুনামগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য কয়ছর এম আহমেদ আমার দেশকে বলেন, আমার নির্বাচনি এলাকায় নদীভাঙনের খবর জেনেছি। শিগগির নদী ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করব। এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলেছি। আশা করি ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ধুনট (বগুড়া) প্রতিনিধি জানান, বগুড়ার ধুনট উপজেলায় যমুনা নদীর অব্যাহত ভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বালুভর্তি জিও ব্যাগ ও টিউব ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করছে। কিন্তু কোনোভাবেই ঠোকানো যাচ্ছে না নদীভাঙন। ভাঙন ধেয়ে আসছে, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও জনবসতির দিকে। ফলে নদীপাড়ের মানুষের মাঝে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৬টায় উপজেলার শহরাবাড়ি যমুনা নদীর ঘাট এলাকায় জিও ব্যাগ ও টিউব ফেলার স্থানে ফের ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভয়াবহ ভাঙনে প্রায় ৫৫ মিটার অংশের জিও ব্যাগ ও টিউবসহ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এ নিয়ে গত তিন দিনে প্রায় ১৫০ মিটার অংশ নদীতে বিলীন হয়েছে। অথচ সেখানে ভাঙন ঠোকাতে তিন দিন ধরে বালুভর্তি জিও ব্যাগ এবং টিউব ফেলা অব্যাহত রয়েছে। তবে নদীপাড়ের মানুষের দাবি এখন ভাঙন রোধে স্থায়ী সমাধান।

কিন্তু সম্প্রতি যমুনা নদীতে আবার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় শুক্রবার থেকে শহরাবাড়ি ও বানিয়াজান স্পারের মধ্যবর্তী কয়েকটি স্থানে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। এ কারণে স্থানীয় লোকজনের মাঝে নতুন করে ভাঙন আতঙ্ক দেখা দেয়।

এদিকে নদী ভাঙনের খবর পাওয়ার পর পরই স্থানীয় সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপসহকারী প্রকৌশলী আব্দুল মালেক জানান, ভাঙন শুরুর পর পরই ভাঙন রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বালুভর্তি এই বিশেষ টিউবগুলো নদীভাঙন রোধে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এ কারণে নদীভাঙনে বিশেষ ক্ষয়ক্ষতির কোনো সম্ভাবনা নেই।

কাজিপুর (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর অরক্ষিত অঞ্চলে ভাঙন দেখা দিয়েছে। নদীতে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে ভাঙনও বেড়েছে। স্থানীয়রা জানান, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে যমুনায় পানি বাড়ছে।

এর সঙ্গে কয়েকদিনে কাজিপুরে ভাঙনে বহু বসতভিটা ও ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটছে নদী তীরবর্তী মানুষের। স্থানীয়রা আরো জানান, পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যমুনার অরক্ষিত এলাকা চরাঞ্চলে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে ভাঙনে বসতভিটা, চরাঞ্চলের আখ, পাট ও বাদামসহ বহু ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেসুর রহমান বলেন, যমুনার অরক্ষিত ও ভাঙনকবলিত স্থানগুলোতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি জানান, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে পদ্মা তীরবর্তী এলাকায় ভয়াবহ নদীভাঙনে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বসতভিটা, ফসলি জমি, রাস্তাঘাট, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ জীবিকার প্রায় সবকিছু হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন ভাঙনকবলিত পরিবারগুলো। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে দিন দিন। জানা গেছে, পদ্মা নদীতে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গত দুই সপ্তাহ ধরে গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ও দেবগ্রাম ইউনিয়নের অন্তত চারটি গ্রামে—উত্তর চর দৌলতদিয়া, মুন্সীবাজার, কাওয়ালজানি ও দেবগ্রামে তীব্র ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এতে শত শত বিঘা ফসলি জমি, কয়েকশ বসতবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ও ধর্মীয় স্থাপনা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। ইতোমধ্যে অনেক স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে এবং ওই এলাকার একমাত্র চলাচলের কাঁচা সড়কটিও ভেঙে গেছে।

এ বিষয়ে রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সুব্রত কুমার বলেন, ভাঙন এলাকা ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরিদর্শন করেছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।

গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাস আমার দেশকে বলেন, ভাঙনকবলিত এলাকায় যেখানে জনবসতি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে, সেসব স্থান অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রক্ষায় দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন