সারিয়াকান্দিতে শামুক-ঝিনুকের সংকটে চুন কারিগরদের দুর্দিন

সারিয়াকান্দিতে শামুক-ঝিনুকের সংকটে চুন কারিগরদের দুর্দিন
সারিয়াকান্দির নিজ বাড়ির কারখানায় চুন তৈরি করছেন সুদেব চন্দ্র। ছবি: আমার দেশ

বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার নদী-নালা আর খাল-বিলে শামুক-ঝিনুকের সংকটে চুনের কারিগরদের এখন দুর্দিন চলছে । জানা গেছে, এখনকার নদ-নদী ও খাল-বিলে একসময় প্রচুর শামুক ও ঝিনুক পাওয়া যেত। আর সেই ঝিনুক পুড়িয়ে চুন তৈরি করেই জীবিকা নির্বাহ করত শত শত পরিবার। তবে পরিবেশ বিপর্যয় ও নদী শুকিয়ে যাওয়ায় এখন আর আগের মতো কাঁচামাল মিলছে না। চরম দুর্দিন আর কাঁচামালের সংকটে পড়ে বংশপরম্পরায় এই পেশা ছেড়ে দিয়েছে শতাধিক পরিবার। অর্থাভাব আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও ঐতিহ্যটি আঁকড়ে কোনো রকমে টিকে আছে মাত্র পাঁচটি পরিবার।

সারিয়াকান্দি উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৫০০ মিটার পশ্চিমে পৌর এলাকার হিন্দুকান্দি গ্রামে গিয়ে দেখা মেলে এই পাঁচ পরিবারের। যাদের একমাত্র পেশা চুন তৈরি করা এবং তা পূর্ব বগুড়ার বিভিন্ন হাটবাজারে বিক্রি করা। কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চুন তৈরির মূল উপাদান ঝিনুক-শামুক। প্রথমে সংগৃহীত ঝিনুক মাটির তৈরি চুলোয় দুই ঘণ্টা ধরে পোড়ানো হয়। আনুমানিক ২০-২৫ কেজি ঝিনুক পোড়াতে প্রয়োজন হয় প্রায় এক মণ জ্বালানি কাঠ। এরপর পোড়া ঝিনুক বিশেষ হাউজ মেশিনে কাঠের লাঠি দিয়ে ঘোটানো হয়। দুজন শ্রমিকের টানা পাঁচ-ছয় ঘণ্টার পরিশ্রমে তৈরি হয় এক মণ চুন, যা বিক্রি করে খরচ বাদে লাভ থাকে প্রায় আড়াই হাজার টাকা। এই সামান্য আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। একসময় নিজেরাই নদী থেকে ঝিনুক কুড়িয়ে আনতেন। কিন্তু এখন শুকিয়ে যাওয়া নদীতে আর ঝিনুক পাওয়া যায় না। ফলে শহরের পাইকারদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে তাদের। ৭০ বছর বয়সি কারিগর সুদেব চন্দ্র আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, চুন তৈরি করে এখন আর আমাদের সংসার চলছে না। আমাদের আগের অন্তারপাড়া গ্রামের প্রায় শতাধিক পরিবার চুন তৈরির ব্যবসা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছে। আগে স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে ধারদেনা করে ব্যবসা ধরে রাখা যেত, এখন আর কেউ ঋণও দিতে চায় না।

বিজ্ঞাপন

একই গ্রামের আরেক কারিগর অনিল চন্দ্র নদীর করুণ অবস্থার কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, আগে বাড়ির পাশের নদী-নালা ও খালে হাত বাড়ালেই প্রচুর পরিমাণে শামুক-ঝিনুক মিলত। এখন আর নদী-নালা বা খালে তা পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে আমাদের বগুড়া শহরতলির মাটিডালি এলাকা থেকে প্রতি মণ শামুক-ঝিনুক ৩ হাজার ৪০০ টাকা দরে কিনে আনতে হচ্ছে।

এ দুই কারিগর জানান, আগে অন্তত শুকনো মৌসুমে নদীতে কিছু শামুক-ঝিনুক মিলত, এখন সেটাও উধাও। বাড়তি দামে কাঁচামাল কিনে চুন তৈরি করে আর পোষায় না। কাঁচামালের সংকট ও লোকসানের মুখেই উপজেলার দুই শতাধিক পরিবার আজ এই পেশা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।

প্রাকৃতিক সম্পদ বিলুপ্ত হওয়া এবং সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ঐতিহ্যবাহী এই চুনশিল্প এখন বিলুপ্তির পথে। কূলহীন অন্ধকারে দিন কাটাচ্ছেন এই পেশার সঙ্গে এখনো লেগে থাকা অল্প কিছু মানুষ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন