ময়নাতদন্তের জন্য প্রায় ২২ ঘণ্টা অপেক্ষার পর রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে এক যুবকের লাশ দাফন করা হয়েছে। পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রতিপক্ষের মারধরের কারণেই শাওন আলী (২৫) মারা গেছেন। তবে হাসপাতালের মৃত্যুসনদে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ডেঙ্গু, কার্ডিওজেনিক শক ও রক্তে সংক্রমণের কথা উল্লেখ থাকায় পুলিশ ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করেনি।
শাওন আলী পেশায় নির্মাণশ্রমিক ছিলেন। তিনি কাকনহাট পৌরসভার সুরসুনিপাড়া মহল্লার বাসিন্দা এবং মোজাফফর আলীর ছেলে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার দুপুর দেড়টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
স্বজনদের অভিযোগ, মৃত্যুর পরপরই তারা গোদাগাড়ী থানার সঙ্গে যোগাযোগ করে ময়নাতদন্তের দাবি জানান। এ বিষয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমানের সঙ্গেও দেখা করেন। কিন্তু মৃত্যুসনদে ডেঙ্গুর কথা উল্লেখ থাকায় পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
জানা গেছে, গত ৩০ জুন ও ১ জুলাই দুই দফায় মারধরের শিকার হন শাওন। এ ঘটনায় ২ জুলাই তার স্ত্রী আদরী বেগম গোদাগাড়ী থানায় লিখিত অভিযোগ দেন।
অভিযোগে বলা হয়, পাওনা টাকা চাইতে গেলে প্রতিবেশী মো. রানা (২৫), তার বাবা মহবুল ইসলাম (৪২) ও মা রিনা বেগম (৩৫) তাকে মারধর করেন। পরদিন রিনা বেগমের ছাগলে তাদের গাছ খাওয়ায় সেটি বেঁধে রাখার কথা বললে আদরীকে মারধর করা হয়।
স্ত্রীকে রক্ষা করতে গিয়ে দ্বিতীয় দফায় হামলার শিকার হন শাওন।
এরপর তাকে রামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও দুই দিন পর বাড়ি ফিরে যান। তবে তিনি আর সুস্থ হননি। ১৭ জুলাই প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে আবার হাসপাতালে ভর্তি করা হলে পরীক্ষায় তার শরীরে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার তার মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর পর সোমবার বিকেলে লাশ গ্রামে নেওয়া হলে এলাকাবাসী দাফনে বাধা দেন। তাদের ধারণা ছিল, পুলিশ এসে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ নিয়ে যাবে। কিন্তু সারা রাত অপেক্ষার পরও পুলিশ না আসায় মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গ্রামের কবরস্থানে লাশ দাফন করা হয়।
মঙ্গলবার সকালে শাওনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, এলাকাবাসী ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করছেন।
তাদের ভাষ্য, মারধরের কারণেই শাওনের মৃত্যু হয়েছে এবং ময়নাতদন্ত হলে প্রকৃত কারণ জানা যেত।
শাওনের স্ত্রী আদরী বেগম বলেন, তার স্বামীকে লাঠি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয়েছিল। প্রথমবার হাসপাতাল থেকে ফিরলেও তিনি আর স্বাভাবিক হতে পারেননি। দ্বিতীয়বার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর ডেঙ্গু শনাক্ত হলেও তার বিশ্বাস, মারধরের আঘাতই মৃত্যুর মূল কারণ।
প্রতিবেশীদের দাবি, মারধরে শাওনের অন্ডকোষে গুরুতর আঘাত লাগে এবং সেখানে ক্ষত সৃষ্টি হয়। মৃত্যুর পরও ওই স্থান থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। তাদের অভিযোগ, অভিযুক্তরা প্রভাবশালী হওয়ায় পুলিশ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি।
প্রতিবেশী কাজিম আলী বলেন, আমাদের দাবি ছিল ময়নাতদন্ত করা হোক, তাহলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যেত। কিন্তু পুলিশ সে ব্যবস্থা করেনি। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর লাশ দাফন করতে বাধ্য হয়েছি। আমরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত চাই।
এদিকে শাওনের মৃত্যুর পর অভিযুক্ত মহবুল ইসলামের পরিবারের সদস্যরা বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। তাদের বাড়িতে তালা ঝুলতে দেখা গেছে। মহবুল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
গোদাগাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আতিকুর রহমান বলেন, ‘দ্বিতীয় দফায় হাসপাতালে ভর্তির সময় এটি পুলিশ কেস হিসেবে নথিভুক্ত হয়নি। মৃত্যুসনদে ডেঙ্গুর কথা উল্লেখ আছে। পুলিশ কেস না হলে আমরা ময়নাতদন্ত করতে পারি না।’ মারধরের ঘটনায় শাওনের স্ত্রীর লিখিত অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অভিযোগ করেছে কি না, সেটা আমার নলেজে নেই। ২০ দিন আগের অভিযোগ নিয়ে এখন বলতে পারব না।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

