আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

রাজশাহীর প্রান্তিক ভোটাররা গণভোট নিয়ে বিভ্রান্তিতে

মঈন উদ্দিন, রাজশাহী

রাজশাহীর প্রান্তিক ভোটাররা গণভোট নিয়ে বিভ্রান্তিতে

আসন্ন সংসদ নির্বাচনের দিনই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে গণভোট। ভোটের দিনক্ষণ কমে এলেও এখনো রাজশাহীর গ্রাম, চর ও বস্তি এলাকার বড় একটি অংশ জানেই না গণভোট কী। কোন বিষয়ে ভোট দিতে হবে, কিংবা ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কীভাবে চিহ্ন দিতে হবে। জেলাজুড়ে নির্বাচনি প্রস্তুতি দৃশ্যমান হলেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে গণভোট নিয়ে চরম বিভ্রান্তি ও অজ্ঞতা দৃশ্যমান। সংসদ নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ থাকলেও গণভোটের বিষয়টি তাদের কাছে একবারে নতুন ও অস্পষ্ট। অনেকেই এখনো জানে না, সংসদ নির্বাচনের ব্যালটের পাশাপাশি আলাদা আরেকটি ব্যালটে ভোট দিতে হবে।

রাজশাহী জেলার পবা, মোহনপুর, তানোর ও বাগমারা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, নির্বাচনি পোস্টার, প্রার্থীদের প্রচার থাকলেও গণভোট বিষয়ে কার্যকর কোনো প্রচারণা চোখে পড়েনি। ফলে ভোটের দিন কী করতে হবে তা নিয়েই দ্বিধাগ্রস্ত ভোটাররা।

বিজ্ঞাপন

মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি বাজারের ভোটার শহিদুল ইসলাম বলেন, ভোট হবে জানি। কিন্তু গণভোট কী জিনিস, সেটা কেউ বলেনি। ব্যালটে আলাদা কিছু থাকবে নাকি, সেটাও বুঝি না।

একই এলাকার গৃহবধূ মোসাম্মৎ জেসমিন জলি বলেন, আমরা তো সাধারণত মার্কা দেখে ভোট দেই। গণভোট যদি আলাদা হয়, আগে থেকে না জানালে ভুল হয়ে যেতে পারে।

পবা উপজেলার শ্যামপুরের দিনমজুর আমিনুল ইসলাম জানান, নির্বাচনের জন্য প্রায় প্রতিদিন লোক আসছে, নানা কথা বলে আমাদের বুঝানো হচ্ছে কিন্তু গণভোটের কথা কেউ বলে না। এটা দেশের জন্য ভালো না খারাপ, সেটাও বুঝতে পারছি না।

একই উপজেলার একটি উপজাতি পল্লীর ভোটার অনিল টুডু বলেন, আমাদের যারা মোড়ল থাকেন, তারাও এখনো কিছু বুঝিয়ে বলেননি। আগে জানালে আমরা ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম।

জানা গেছে, ‘দেশের চাবি আপনার হাতে’ স্লোগান সামনে রেখে অন্তর্বর্তী সরকার ডিজিটাল বিলবোর্ড ও ভোটের গাড়ির মাধ্যমে গণভোটের প্রচারণা চালাচ্ছে। তবে এই প্রচার কার্যক্রম মূলত শহরকেন্দ্রিক। উপজেলা বা গ্রামাঞ্চলে মাইকিং, উঠান বৈঠক কিংবা সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ কার্যত নেই বললেই চলে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহমুদুর রহমান বলেন, গণভোট একটি সংবিধানিক ও জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু সাধারণ ভোটাররা এখনো জানে না গণভোট কী, কেন দিতে হবে এবং কীভাবে দিতে হবে। গ্রামভিত্তিক হাতে-কলমে বোঝানো না হলে এই অজ্ঞতা কাটবে না। মসজিদে জুমার খুতবা, হাটবাজারে মাইকিং ও রাজনৈতিক সমাবেশে এ বিষয়ে স্পষ্ট আলোচনা জরুরি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট আনোয়ার হোসেন মনে করেন, একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট হলে স্বাভাবিকভাবেই ভোটারদের বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। যদি আগেভাগে পরিষ্কারভাবে বোঝানো না হয়, তাহলে অনেক ভোটার গণভোটে অংশ নিতেই পারবেন না। এতে গণভোটের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।

সামাজিক গবেষক ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের সদস্য নারগীস বেগম বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বরাবরই তথ্য থেকে বঞ্চিত থাকে। শহরকেন্দ্রিক প্রচারণা দিয়ে গণভোটের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সফল করা যাবে না। প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে স্থানীয় ভাষায়, সহজভাবে ভোটারদের কাছে যেতে হবে।

এ বিষয়ে জেলা নির্বাচন অফিস সূত্র জানায়, গণভোট বিষয়ে প্রচারণা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, তত দ্রুত মাঠপর্যায়ে স্পষ্ট ও সরাসরি সচেতনতা কার্যক্রম চালানো জরুরি।

রাজশাহী জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার আফিয়া আখতার বলেন, গণভোট বিষয়ে ইউনিয়ন পর্যায় থেকে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত আমাদের প্রচারণা চলছে। ভোটের গাড়ি ও ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করা হচ্ছে। আশা করছি নির্বাচনের আগেই ভোটাররা বিষয়টি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবেন। এ সময় তিনি গণভোট বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সহযোগিতাও কামনা করেন।

তবে নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, গণভোট সম্পর্কে প্রান্তিক ভোটারদের অজ্ঞতা শুধু ভোট দিতে ভুলই সৃষ্টি করবে না, বরং পুরো প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। তাই এখনই গণমাধ্যম, প্রশাসন ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত এবং মাঠভিত্তিক উদ্যোগ জরুরি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন