দুই দফায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার পর ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা এবং দুধকুমার অববাহিকায় কুড়িগ্রাম জেলার প্রায় ৪০ পয়েন্টে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এসব ভাঙনপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে ৩০ পয়েন্টে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে চরাঞ্চলের জন্য জিও ব্যাগ বরাদ্দ না থাকায় চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ওই এলাকার মানুষ।
কুড়িগ্রামের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রাজিরপুর উপজেলার চরসাজাই, পাইকান্টারিপাড়া, ভেলামারী ও শংকর মাধবপুর; রৌমারী উপজেলার সোনাপুর, সুখেরবাতি, ঘুঘুমারী, গেন্দার আলগা ও দক্ষিণ নামাজের চর; চিলমারী উপজেলার কাচকোল, কড়াই বরিশাল, বিশারপাড়া, শাখাহাতি ও দক্ষিণ খাউরিয়া; ভুরুঙ্গামারী উপজেলার আন্ধারীঝাড়, উত্তর ধলডাঙ্গা ও দক্ষিণ ধলডাঙ্গা; নাগেশ্বরী উপজেলার গোয়ালটারী, কুটির চর, দামাল গ্রাম, ফান্দের চর, ধাউরার কুটি, হাজির মোড় ও মোল্লার হাট; উলিপুর উপজেলার উত্তর নামাজের চর, গোড়াইপিয়ার, থেতরাই বাজার, হাতিয়া ও বেগমগঞ্জ; সদর উপজেলার ঝুনকার চর, পাটেশ্বরী বাজার এলাকা ও বানিয়াপাড়া; রাজারহাট উপজেলার চরবিদ্যানন্দ, রামহরি, গতিয়াসাম ও কালির মেলা এবং ফুলবাড়ী উপজেলার গোড়কমণ্ডলসহ প্রায় ৪০ পয়েন্টে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এসব এলাকার অধিকাংশ জায়গা নদীর চরে অবস্থিত।
এর মধ্যে গত এক মাসে ব্রহ্মপুত্রের তীব্র ভাঙনে চিলমারী ইউনিয়নের চর কড়াই বরিশাল, বিশারপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্প ও চরশাখাহাতি এলাকায় অন্তত ৭০টি, রৌমারীর সুখেরবাতি, ঘুঘুমারী, গেন্দার আলগা ও দক্ষিণ নামাজের চরের প্রায় ১০০টি, তিস্তার ভাঙনে রাজারহাটের রামহরি, কালিরমেলা ও চরবিদ্যানন্দ এলাকায় ২৫টি এবং দুধকুমারের ভাঙনে নাগেশ্বরীর ধাউরারকুটি, কুটির চর ও চরদামাল গ্রামের প্রায় ১২০টি পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে।
ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে, কেউ পাশের চরে আবার কেউ উঁচু জায়গায় ঘর সরিয়ে নতুন করে বসতি গড়ার চেষ্টা করছেন। তবে এসব চরের মানুষের কোথাও স্থায়ী আশ্রয়ের কোনো নিশ্চয়তা নেই।
এছাড়া ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে ফসলি জমিসহ প্রায় কয়েক হাজার পরিবার। ঝুঁকিতে পড়েছে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, ভূমি অফিস, বাজার, নির্মাণাধীন বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র, মসজিদ, মাদরাসাসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
ভাঙনের ঝুঁকি থাকলেও চরের এসব এলাকা রক্ষার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো বরাদ্দ নেই।
কড়াই বরিশাল চরের বাসিন্দা ধলু মিয়া বলেন, প্রতি বছরই আমাদের এলাকায় নদীভাঙন দেখা দেয়। এবারও গত কয়েক দিনে ৭০ থেকে ৮০টি বাড়ি নদীগর্ভে চলে গেছে। অথচ সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। শুনেছি চরাঞ্চলের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো বরাদ্দ নেই। আমরা চরের মানুষ কি সরকারকে ট্যাক্স দেই না? তাহলে আমাদের জন্য বরাদ্দ থাকবে না কেন?
নয়ারহাট ইউনিয়নের বাসিন্দা হালিমা খাতুন বলেন, জন্মের পর থেকেই দেখে আসছি প্রতি বছর শত শত বাড়ি, ফসলি জমি এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। অথচ সরকার এসব রক্ষায় কোনো ব্যবস্থা নেয় না। সরকার বদলায় কিন্তু চরের মানুষের ভাগ্য বদলায় না।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, জেলার ৩০টি পয়েন্টে নদীভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলমান রয়েছে। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের কবলে পড়ছে। সেগুলোর জন্যও বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। তবে চরাঞ্চলে স্থায়ী নদীরক্ষা প্রকল্পের জন্য কিংবা জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগের জন্য তাদের কোনো বরাদ্দ নেই।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

