তালিকায় মৃত ব্যক্তির নাম

রৌমারীতে খাদ্যগুদাম কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ

রৌমারীতে খাদ্যগুদাম কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ
ইনসেটে খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিটন কুমার রায়। ছবি: আমার দেশ

চলতি বোরো মৌসুমে ধান সংগ্রহে সিন্ডিকেটের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ধান নিয়ে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে কুড়িগ্রামের রৌমারী সরকারি খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিটন কুমার রায়ের বিরুদ্ধে। লটারিতে নাম উঠলেও গোডাউনে ধান দিতে না পারা, তালিকায় মৃত ব্যক্তির নাম, আবার নাম ঠিক থাকলেও মোবাইল নাম্বার ভিন্ন, কৃষকদের হয়রানি, উৎকচ চাওয়া, এক শতক জমিত নাই বা কৃষির সঙ্গে জড়িত নয় এমন ব্যক্তিদের নাম, সিন্ডিকেটের সদস্যরা কৃষকের নাম ভাগবাটোয়ার করে নেওয়াসহ হেন কোনো অভিযোগ নেই যা উঠেনি ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, রৌমারী খাদ্যগুদামের কৃষকের তালিকায় ৩২২ জনের নাম থাকার কথা থাকলেও ৩২৩ জন কৃষকের নাম রয়েছে। চলতি মৌসুমে এই উপজেলায় মোট ৯৬৬ মেট্রিক টন ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে গত ২৪ মে ধান সংগ্রহের কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। সেই থেকে ধান ক্রয়ের ডিজিটালাইজড নিয়ম না মেনে, নতুন বস্তায় ধান সংগ্রহের নিয়ম থাকলেও পুরাতন-জরাজীর্ণ বস্তায় করা হচ্ছে ধান সংগ্রহ।

বিজ্ঞাপন

খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিটন কুমার রায়ের বিরুদ্ধে রয়েছে বন্ধের দিন ও রাতের আঁধারে ধান গুদামজাত করার অভিযোগও রয়েছে। এছাড়া স্থানীয় প্রশাসন ও সাংবাদিক ম্যানেজ করার কথা বলে প্রতি ৩ মেট্রিক টন ধানের জন্য কৃষক প্রতি ৩ হাজার ৩০০ টাকা উৎকোচ নেওয়া, সিন্ডিকেট সদস্যদের মধ্যে একেক জনকে ২০-৩০ জনের বিল দেওয়ারও অভিযোগও আছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

উপজেলার বন্দবেড় গ্রামের মাহমুদুল বলেন, লটারির তালিকায় আমার নাম থাকার পরেও গুদামখাদ্য কর্মকর্তা আমার ধান গ্রহণ করেননি এবং আমার বিলকে বা কারা উত্তোলন করেছেন জানতে বিষয়টি নিয়ে চাপ প্রয়োগ করলে সোমবার ওই খাদ্যগুদাম কর্মকর্তা বলেন, ‘আপনার বিলটি অন্য কেউ করেছে, আপনি ১৯ হাজার টাকা নিয়ে আপস হয়ে যান। একপর্যায় আপস হতে বাধ্য করেন।

উপজেলার দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের শান্তির গ্রামের কৃষক আশরাফুল ইসলাম জানান, ‘তালিকায় আমাদের নাম থাকার পরেও খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমারদের ধান নিতে রাজি হননি। পরে আমরা কুড়িগ্রাম-৪ আসনের এমপি মোস্তাফিজুর রহমানের সুপারিশ নিয়ে যাই। তাতেও কাজ হয়নি। পরে তিনি আমাদেরকে মণপ্রতি ১০০ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করেন বিষয়টি সুরাহার জন্য । আমরা তাতেও রাজি হয়নি।

একই গ্রামের বাসিন্দা আছুর উদ্দিন ও আজিজুল হকের অভিযোগ করে বললেন, ‘আমাদের গ্রাম থেকে ফুড গোডাউন ২২ কিলোমিটার দূরত্বে এখন পর্যন্ত চার দিন গিয়েছিলাম, গোডাউন কিন্তু আমাদের ধান নেয়নি। পরে ১২ আগস্ট বিকেলে খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিটন কুমার রায় আমাদের ডেকে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে রফাদফা করে নেন।

কিন্তু ১২ আগস্ট খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিটন কুমার রায় দুপুরে আমার দেশকে বলেন, ‘ধান গ্রহণ করা শেষ হয়েছে।’

তবে অভিযুক্ত কর্মকর্তা দুপুরে বললেন ধান নেওয়া শেষ, কিন্তু বিকেলে কোন নিয়মে ওই তিন কৃষকের ধান গ্রহণ করলেন -এ প্রশ্ন রয়েই যায়।

ধান গ্রহণের সময় শেষ হলেও এখনো কৃষক মানিক উল্লাহ, নছু শেখ, শিরিয়াসহ আরো অনেক কৃষকের ধান গ্রহণ না করে সিন্ডিকেট সদস্যদের বিল দিয়েছেন বলে জানা যায়।

প্রতিবেদকের হাতে আসা ধান সংগ্রহের তালিকা বিশ্লষণ করে দেখা যায়, চরশৌলামারী ইউনিয়নের সোলায়মান নামের কৃষকের মোবাইল নাম্বারে বন্দবেড় গ্রামের নান্নু মিয়ার মোবাইল নাম্বার। নান্নু মিয়া জানালেন, ‘আমি তো আবেদন করি নাই। আমার মোবাইল নাম্বার কে ব্যবহার করেছে তা আমার জানা নাই। একইভাবে আব্দুল হামিদ, সোহেল রানা, জাহিদুল ইসলাম, খুকুমণি, আইয়ূব, জয়নাব বেগম, সাদাকাত, জুলফিকার, আলী হোসেন, নূর ছলিমা, শিরিয়া ও আছর উদ্দিনসহ আরও অনেকের নাম ঠিক থাকলেও ফোন নাম্বার অন্য ব্যক্তির। প্রতিবেদক ফোন করে পরিচয় চাইলেও দিতে নারাজ তারা।

দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়নের খেতারচর গ্রামের কৃষক মনিরুজ্জামান মনির জানালেন আরো গুরুতর অভিযোগ। তিনি জানালেন, রৌমারী উপজেলা খাদ্য গোডাউনে ধান ঢুকানোর জন্য প্রতি মণে আমার কাছ থেকে ৫০ টাকা নিয়েছেন খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিটন কুমার রায়।

অভিযোগের বিষয়ে কথা হয় রৌমারী খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিটন কুমার রায়ের সঙ্গে। প্রথমে তিনি জানান, তার গোডাউনে ধান সংগ্রহ শেষ হয়েছে। তাহলে তালিকায় কৃষকের নাম থাকা সত্ত্বেও কেন অনেকে ধান দিতে পারে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তাদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে তাদের ধান নিব আমি।’

ভিন্ন নাম ও মোবাইল নাম্বার প্রসঙ্গে তিনি উত্তর দেননি প্রতিবেদককে। তিনি শুধু বারবার এই প্রতিবেদকে বলতে থাকেন ‘কী তথ্য লাগে বলেন।’

রৌমারী খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিটন কুমার রায় সিন্ডিকেটের সঙ্গে হাত মিলিয়ে উৎকোচ নেওয়া, একজনের বিল অন্য জনকে দেওয়া ও কৃষক তালিকার নানা অসংগতির বিষয়ে কথা হয় জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ কাজী হামিদুল হকের সঙ্গে। তিনি ‘ঠিক আছে বিষয়টি বুঝতে পেরেছি’ বলেই মোবাইল ফোনের কল কেটে দেন।

অভিযুক্ত ওই কর্মকর্তার অভিযোগের বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বললে তিনি বলেন, ‘রৌমারীর টিএনও আমার সামনেই আছে। হোয়াটস অ্যাপে টেক্স করেন বিষয়টি আমি দেখছি।’

রৌমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহবুবুল হাসান বলেন, ‘বিষয়টি আমি জেনেছি, যাচাই-বাছাই করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন