চিরিরবন্দরে দুই শিশুসহ গৃহবধূকে হত্যা, শ্বশুর-শাশুড়ি আটক

চিরিরবন্দরে দুই শিশুসহ গৃহবধূকে হত্যা, শ্বশুর-শাশুড়ি আটক
ছবি: সংগৃহীত

চিরিরবন্দরে দুই শিশুসন্তানসহ স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনায় পুলিশ ঘাতক স্বামী, শ্বশুর ও শাশুড়িকে আটক করে লাশ উদ্ধার করেছে।

সোমবার দুপরে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ দিমেক হাসপাতালে পাঠিয়েছে। এ ঘটনায় রোববার রাত ১২টায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ মৃত গৃহবধূর স্বামী, শ্বশুর ও শাশুড়িকে হেফাজতে নিয়েছে। শিশু দুটিকে হত্যা করার আলামত মিললেও গৃহবধূ নিজে আত্মহত্যা করেছেন, নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে, শিশু দুটিকে কে হত্যা করেছে—এ রহস্য রোববার দিবাগত রাত ২টা পর্যন্ত উদ্ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। এ ঘটনায় মৃত গৃহবধূর বাবা খাইরুল ইসলাম সোমবার দুপুর ১২টায় বাদী হয়ে চিরিরবন্দর থানায় তিনজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামল করেন।

বিজ্ঞাপন

চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি গত ১৮ অক্টোবর রোববার দুপুর আড়াইটা থেকে সন্ধ্যার ঠিক পূর্বমুহূর্তে কোনো এক সময় উপজেলার অমরপুর ইউনিয়নের জুগির ডাঙ্গা মাঠের পূর্ব পাশে মোস্তফাপুর বালুপাড়ায় ঘটেছে। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টিসহ শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

দিনাজপুর জেলা পুলিশ সুপার জেদান আল মুসা, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আনোয়ার হোসেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আব্দুল হালিম, থানার অফিসার ইনচার্জ মাহমুদুন নবী, জেলা গোয়েন্দা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ আলমগীর হোসেন, জেলা সিআইডির পুলিশ সুপার, পরিদর্শক, সিআইডির ক্রাইমসিন বিশেষজ্ঞগণ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছেন।

সরজমিনে গিয়ে জানা গেছে, মোস্তফাপুর বালুপাড়ার মাহতাব উদ্দিনের ছেলে শাকিল হোসেনের (২৬) সঙ্গে পার্বতীপুর উপজেলার পলাশবাড়ী এলাকার খাইরুল ইসলামের মেয়ে স্বর্ণা বেগমের (২০) সঙ্গে সাড়ে তিন বছর আগে প্রেমের সূত্র ধরে বিয়ে হয়। ওই দম্পতির এক ছেলে সাফায়াত হোসেন (২) ও এক মেয়ে রাইফা জুরাইনা (৯ মাস) নামে দুটি শিশুসন্তানের লাশ ঘরের বিছানায় পড়ে ছিল এবং স্ত্রীর লাশ ঘরের মেঝেতে শোয়ানো ছিল।

স্বামী মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকা, মাদক সেবন করা নিয়ে মাঝেমধ্যে স্বামী-স্ত্রীর বাগ্বিতণ্ডাসহ টুকটাক ঝগড়া-বিবাদ থাকত। সংসারের অভাব-অনটনের কারণে স্বামী শাকিল অটো চালাতেন। অনেক রাতে বাড়িতে ফিরতেন।

স্বামী শাকিল হোসেন জানান, দুপুরের পর অটো নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় স্ত্রী বাবার বাড়ি যাওয়ার জন্য টাকার আবদার করলে তিনি পরের দিন যাওয়ার কথা জানান। স্ত্রী খুব জেদি হওয়ায় তাকে কিছু না বলে অটো নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। সন্ধ্য়ায় বাড়ি ফিরে অনেক ডাকাডাকি করে ঘরের দরজা না খোলায় দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে আবছা আলোয় স্ত্রীকে ঝুলন্ত ও সন্তান দুটোকে মরে পড়ে থাকতে দেখেন।

মৃত গৃহবধূর শ্বশুর মাহাতাব উদ্দিন জানান, ‘অন্যের বাড়িতে মজুরের কাজ শেষে সন্ধ্যার পরপরই বাড়িতে ফিরি। ভাত খাওয়ার সময় ছেলের বউ, নাতি-নাতনি কারো কোনো সাড়া না পাওয়ায় অনেক ডাকাডাকি করি। দরজা না খোলায় বাড়ির মধ্যে বরাবর টিনের বেড়া ভেঙে ছেলের ঘরের দরজা খুলে বউমার লাশ নামিয়ে আনি। চিৎকার-চেঁচামেচিতে প্রতিবেশীরা এগিয়ে আসে এবং আমার স্ত্রী নাতি-নাতনি দুটোকে কোলে নিয়ে কান্না শুরু করে।’

মৃত গৃহবধূর মা আনজু আরা বলেন, তার জামাই শাকিল তাদের ফোনে জানান, তাদের মেয়ে সন্তানগুলোকে মেরে নিজে আত্মহত্যা করেছেন। সংবাদ পেয়ে দ্রুত জামাইয়ের বাড়িতে আসি। তবে তিন মাস আগে মেয়ে জানিয়েছিলেন, জামাই নেশা করেন।

মৃত গৃহবধূর বড় ভাই ও শাকিলের ভগ্নিপতি শাহানুর সজীব বলেন, ‘আমি বিয়ের পর থেকে ছয় বছর এই বাড়িতে পাশাপাশি লাগোয়া ঘরে থাকতাম। বর্তমানে ঢাকায় থাকলেও ছুটিতে এসে গত ১৭ অক্টোবর শনিবার এই বাড়িতেই ছিলাম। বোন আত্মহত্যা করেছে নাকি স্বামী মেরে ফেলেছে, ঘটনাটি বুঝতে পারছি না।’

স্থানীয় ইউপি সদস্য নুর আমিন শাহ বলেন, তাদের পারিবারিক কলহ ছিল না। কেউ কোনো দিন অভিযোগ দেয়নি। কেন এমন ঘটনা ঘটল, বোঝা যাচ্ছে না। প্রশাসন এসেছে, তারা তদন্ত করছে। ঘরের দেয়ালে কিছু লেখা ছিল, লেখাগুলি কে লিখেছে, জানা যাচ্ছে না। তবে লেখা ছিল—‘আজ থেকে এ গল্প শেষ। আমি অভাগি মা। আমার সন্তানদের নিজে মারছি। সন্তানদের পুলিশের কাছে দিয়েন না। লাশ পলাশবাড়িতে মাটি দেন। শাকিল যেন না ছোয়, বাবা-মা সরি।’ ‘আই লাভ ইউ’ চিহ্ন ছিল।

ঘটনাস্থলে জেলা পুলিশ সুপার জেদান আল মুসা বলেন, ঘটনার প্রকৃত রহস্য বা মোটিভ উদ্ধার করতে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট কাজ শুরু করেছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এটি একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা। আমরা আলামত সংগ্রহ করেছি, সুরতহাল করেছি। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গৃহবধূর স্বামী শাকিল হোসেন (২৬), শ্বশুর মাহাতাব উদ্দিন (৫০) ও শাশুড়ি রহমত আলা তারা বিবিকে (৪২) হেফাজতে নিয়েছি। লাশগুলোর ময়নাতদন্ত করে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করা যাবে।’

থানার অফিসার ইনচার্জ মাহমুদুন নবী বলেন, ‘সংবাদ পাওয়ামাত্রই দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাই।

এলাকাবাসী ক্রাইম স্পটে অনেক ভিড় করে ছিল। দ্রুত এলাকাটি ফাঁকা করে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করি। রাত প্রায় সাড়ে ১২টার দিকে সিআইডির ক্রাইম বিশেষজ্ঞ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এরপর লাশগুলো উদ্ধার করে থানায় নেওয়া হয়।’

এ ঘটনায় গৃহবধূর বাবা সোমবার দুপুরে বাদী হয়ে থানায় একটি এজাহার দায়ের করলে মামলাটি রুজু করা হয়েছে। রাতে থানায় জিজ্ঞাসাবাদের সময় স্বামী শাকিল নিজেই সন্তানসহ স্ত্রীকে হত্যার কথা স্বীকার করেছে। ঘটনাটির প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে অধিকতর তদন্ত ও অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন