জীবন ও জীবিকার তাগিদে কেউ বেছে নেন চাকরি, আবার কেউ পা বাড়ান ব্যবসার দিকে। তবে হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে চলেছেন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জের আব্দুল খালেক। পৈতৃক পেশা মধু সংগ্রহ। ঝুঁকিপূর্ণ হলেও পেশাটি ছেড়ে যাননি তিনি। মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন প্রাকৃতিক খাঁটি মধু।
উপজেলার বিনোদনগর ইউনিয়নের পলিরামদেবপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল খালেক (৪২)। স্থানীয়ভাবে তিনি পরিচিত মৌয়াল খালেক নামে। উঁচু গাছ, পুরনো বাড়ির কার্নিশ কিংবা বিরল বনের ভেতরে গাছের ডালে ঝুলে থাকা মৌচাক—এসবই তার উপার্জনের উৎস। সুরক্ষা পোশাক ছাড়াই হাতে ধোঁয়া জ্বালানো টর্চ আর ধারালো দা নিয়ে রাত বা ভোরে মধু সংগ্রহ করেন তিনি।
আব্দুল খালেক বলেন, মধু সংগ্রহ সহজ নয়। ডজন ডজন মৌমাছি আক্রমণ করে। ডঙ্কা খেয়ে অনেক সময় শরীর ফুলে যায়। তবু এই কাজটা ভালোবাসি। আমার বাবাও এই পেশায় ছিলেন। তাঁর কাছ থেকেই শিখেছি প্রতিটি কৌশল। যাদের বাড়িতে, বাগানে মৌচাক হয় তারা খবর দেন। চাক কেটে মধু ভাগ করি—অর্ধেক আমি রাখি, অর্ধেক বাড়ির মালিক। মাসে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার মতো আয় হয়। তবে শীতের সময় মধু কম থাকে, তখন আয়ও কমে যায়।
তিনি আরও বলেন, এ পেশা ধরে রাখতে অনেক বাধাও এসেছে। তার ভাষায়, অনেককে এই কাজ শেখানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু ঝুঁকি বেশি বলে সবাই ভয় পায়। ফলে মধু সংগ্রহের ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। এখন প্রায় একাই করছি। টাকার জন্য নয়, নিজের পিতার পেশা বাঁচিয়ে রাখতেই কাজ করছি। আমি চাই খাঁটি মধু সবাইকে খাওয়াতে।
মধু ক্রেতা নবাবগঞ্জ বাজারের আরিফুল ইসলাম বলেন, বাজারে নকল আর ভেজাল মধুর ছড়াছড়ি। তাই খালেক ভাইয়ের কাছে ছাড়া কোথাও থেকে মধু কিনি না। ওনার মধু একেবারেই খাঁটি এবং প্রাকৃতিক। এ রকম মানুষের সংখ্যা এখন কম।
বালুয়াচড়া গ্রামের বাসিন্দা আবুল কালাম বলেন, খালেক শুধু নিজের জীবিকা নয়, আমাদের এলাকার সুনামও বয়ে আনছে। খাঁটি মধুর জন্য এখন বাইরে থেকেও মানুষ আসে তাঁর কাছে। আমরাও তার কাছে খাটি মধু নেয়। আসল মধু পাওয়া দুস্কর বিষয় হলেও আ. খালেক মিয়ার কাছে আমরা বিশ্বস্ততার সঙ্গে মধু কিনি।
নবাবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম ইলিয়াস বলেন, স্থানীয় মৌয়ালরা যে সাহস ও শ্রম দিয়ে মধু সংগ্রহ করেন তা প্রশংসনীয়। তবে ঝুঁকি রয়েছে। আমরা চাই তারা যেন আধুনিক প্রযুক্তিতে মৌ চাষ শুরু করেন। নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম পেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।

