একসময় যেসব বাদ্যযন্ত্রের সুরে গ্রামবাংলার মেলা, যাত্রাপালা, কীর্তন কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানের আসর জমে উঠত, সেগুলোই এখন অনেকটা নীরব। ওই সময় তবলা, ডুগি, ঢোল, কর্তাল আর দোতারাই ছিল চিত্তবিনোদনের আসরের প্রধান সরঞ্জাম।
তবে সময়ের আবর্তে আধুনিকতার ছোঁয়ায় ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম, ইলেকট্রনিক বাদ্যযন্ত্র ও অর্কেস্ট্রার প্রভাবে হারিয়ে যাচ্ছে চার পুরুষের সেই গ্রামীণ বাদ্য যন্ত্রের জৌলুস। পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের কারিগররাও।
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী পৌর বাজারের ননী গোপাল মোড়; ব্যস্ত বাজার। চারপাশে দোকানপাট, মানুষের কোলাহল, যানবাহনের শব্দ। এর মাঝেই ছোট্ট একটি দোকান। নাম ‘স্বপন তবলা ঘর’। দরজার সামনে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে তাক জুড়ে সাজানো দেশীয় বাদ্য যন্ত্র। এখানে বাদ্যযন্ত্র তৈরি ও মেরামত করা হয়।
দোকানের মালিক রবিন দাস। চার পুরুষ ধরে তার পরিবার এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু দোকানের তাকজুড়ে সাজানো বাদ্যযন্ত্রগুলোর দিকে তাকালে এখন আনন্দের চেয়ে আক্ষেপই বেশি ধরা পড়ে তাঁর চোখেমুখে।
সময় বদলেছে। মানুষের বিনোদনের ধরন বদলেছে। বিয়ে, মিছিল, কবিগান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা যাত্রাপালায় এখন কি-বোর্ড, অর্কেস্ট্রা ও ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেমের দাপট। হাতে তৈরি তবলা, ঢোল কিংবা দোতারার সেই আগের চাহিদা নেই। আর তার সঙ্গে কমে গেছে এসব বাদ্যযন্ত্র তৈরির কারিগরদের কাজও।
রবিন দাস বলেন, তার বাবার দাদু এই কাজ শুরু করেছিলেন। তার কাছ থেকে দাদু, দাদুর কাছ থেকে বাবা এবং বাবা ও দাদুর কাছ থেকে তিনি শিখেছেন বাদ্যযন্ত্র তৈরি ও মেরামতের কাজ। ছোটবেলা থেকেই দোকান আর বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে তার বেড়ে ওঠা।
একসময় আমাদের দোকানের বেশ পরিচিতি ছিল। ফুলবাড়ী ছাড়াও আশপাশের উপজেলা, এমনকি দূরের বিভিন্ন জেলা থেকেও মানুষ বাদ্যযন্ত্র কিনতে আসতেন। তবলা, ডুগি, ঢোল, কর্তাল আর দোতারার ভালো চাহিদা ছিল। এখন সেই জৌলুস নেই, বলেন রবিন।
বাবার মৃত্যুর পরও পেশাটি আঁকড়ে আছেন তিনি। কিন্তু আগের মতো বিক্রি নেই। দোকানে তৈরি করে রাখা বাদ্যযন্ত্র অনেক সময় মাসের পর মাস পড়ে থাকে।
দোকানের একটি তবলার ওপর হাত রেখে রবিন বলেন, আগে বিভিন্ন অনুষ্ঠান সামনে রেখে মানুষ এসে তবলা, ঢোল কিংবা দোতারা কিনতেন। পালাগান, কীর্তন, বাউল আসর কিংবা গ্রামীণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এসব বাদ্যযন্ত্রের ছিল আলাদা মর্যাদা। এখন আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সহজলভ্যতায় সেই জায়গাটি অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে।
সব জায়গায় এখন আধুনিকতার ছোঁয়া। বিয়ে, গ্রামীণ যাত্রাপালা, সবখানেই কি-বোর্ড, অর্কেস্ট্রা আর ডিজিটাল সাউন্ড। দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের সুর এখন আর তেমন কেউ শুনতে চায় না, কিনতেও চায় না, বলেন তিনি।
কথার একপর্যায়ে রবিনের কণ্ঠে জমে ওঠে অন্যরকম আক্ষেপ। চার পুরুষ ধরে চলে আসা এই পেশা তার পরেই থেমে যেতে পারে।
ছেলেমেয়েদের এই পেশায় আনবেন কি না, জানতে চাইলে রবিন বলেন, না। তাদের পড়ালেখা শিখিয়ে চাকরি-বাকরি করতে দেব। এই কাজ করে এখন আর সংসার চলে না।
শুধু রবিন দাসের দোকান নয়, ফুলবাড়ীর বাদ্যযন্ত্র ব্যবসার সামগ্রিক চিত্রও বদলে গেছে। পৌর বাজারের ‘দাস মিউজিক্যালস’-এর কর্ণধার ও সংগীত শিক্ষক প্রবীর কুমার দাস বাবুও একই অভিজ্ঞতার কথা জানান।
তার মতে, হাতে তৈরি বাদ্যযন্ত্রের বাজার সংকুচিত হওয়ার পেছনে আধুনিক প্রযুক্তির বড় ভূমিকা রয়েছে। এখন ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম, ইলেকট্রনিক বাদ্যযন্ত্র ও অর্কেস্ট্রা সহজেই পাওয়া যায়। ফলে অনুষ্ঠানের আয়োজকেরা আগের মতো দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের ওপর নির্ভর করছেন না।
প্রবীর কুমার দাস বাবু বলেন, কারিগর রেখে হাতে তৈরি বাদ্যযন্ত্র বানিয়ে বিক্রি করেও এখন তেমন লাভ হয় না। তাই তিনিও বাইরে থেকে বাদ্যযন্ত্র এনে বিক্রি করছেন। দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের পাশাপাশি তার দোকানে জায়গা করে নিয়েছে আধুনিক ও ডিজিটাল বাদ্যযন্ত্র।
তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে শুধু একটি ব্যবসা নয়। হারিয়ে যাচ্ছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা একটি কারিগরি জ্ঞানও। একটি তবলা কীভাবে তৈরি হবে, ঢোলের কাঠামো কেমন হবে, চামড়ার টান কতটা রাখতে হবে কিংবা দোতারার সুর ঠিক করতে কী করতে হয়, এসব অভিজ্ঞতা বই পড়ে শেখা যায় না। এগুলো তৈরি হয় দীর্ঘদিনের হাতে-কলমে কাজের মধ্য দিয়ে।
ফুলবাড়ীর ‘স্বপন তবলা ঘর’-এর নীরব তাকগুলো তাই কেবল কয়েকটি পুরোনো বাদ্যযন্ত্রের গল্প বলে না। বলে একটি বদলে যাওয়া সময়ের গল্পও।
একসময় যে সুরে গ্রামবাংলার মানুষের আনন্দ, উৎসব আর আবেগ মিশে থাকত, সেই সুর আজ আধুনিক শব্দের ভিড়ে ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। রবিন দাসের মতো কারিগররা পেশাটি ধরে রাখার চেষ্টা করছেন ঠিকই, কিন্তু উত্তরসূরি না থাকলে তাঁদের সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে সেই শিল্পেরও একটি অধ্যায়।
হয়তো কোনো একদিন তবলা, ঢোল কিংবা দোতারা হাতে নিয়ে নতুন প্রজন্ম আবার জানতে চাইবে, এসব বাদ্যযন্ত্র কীভাবে তৈরি হতো। তখন ফুলবাড়ীর কোনো পুরোনো দোকানের বন্ধ শাটারের সামনে দাঁড়িয়ে হয়তো মনে পড়বে রবিন দাসদের কথা। মনে হবে, একসময় এখানে মানুষ বাদ্যযন্ত্র বানাত। আর সেই বাদ্যযন্ত্রের সুরে মুখর হয়ে উঠত গ্রামবাংলার জীবন।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

