শিক্ষক বদলির নীতিমালা ভঙ্গ করে ‘মানবিক’ সাজলেন ইউএনও

শিক্ষক বদলির নীতিমালা ভঙ্গ করে ‘মানবিক’ সাজলেন ইউএনও

কুড়িগ্রামের চিলমারীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বদলিতে প্রকাশ্য অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে। বদলি নীতিমালা ও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে অনৈতিক আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে এসব বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষক সমাজ। অভিযোগ রয়েছে, বদলির ক্ষেত্রে মানবিক কারণকে সামনে আনা হলেও এর আড়ালে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তবে বদলি প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও নিজের অবস্থানে অনড় রয়েছেন চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ‘উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তিকরণ বিষয়ক কমিটির’ সভাপতি মো. মাহমুদুল হাসান। তাঁর দাবি, স্পষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করেই সব বদলি কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। যদিও ১১ জন শিক্ষকের বদলির আদেশের মধ্যে অন্তত আটজনের বদলির ক্ষেত্রে নীতিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে শিক্ষক বদলি নিয়ে একাধিক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলেও বিতর্কিত বদলির আদেশ বহাল রাখার অবস্থানে রয়েছেন ইউএনও ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা।

ইউএনও মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘নীতিমালা লঙ্ঘন হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কাছে যাঁদের বদলি করা হয়েছে, তাঁদের জ্যেষ্ঠতার তালিকা আছে। যাঁরা আবেদন করেছেন, প্রত্যেকের জ্যেষ্ঠতার তালিকা দেওয়া আছে। আপনি গিয়ে দেখেন।’

বদলি তালিকার ৪ নম্বর ক্রমিকে থাকা মোছা. তামান্না ইসলাম তৃষাকে নাওশালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ফকিরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। ফকিরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনজন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে তাঁকে বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অন্যদিকে, বদলি তালিকার ৫ নম্বর ক্রমিকে থাকা মো. নুর আলমকে গৌড়মোহনহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে রাজারভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। রাজারভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চারটি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত ছিলেন মাত্র একজন শিক্ষক। তাঁকেও বদলি করায় বিদ্যালয়টি বর্তমানে শিক্ষকশূন্য হয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে।

শিক্ষকশূন্য করে বদলির আদেশ দেওয়া নীতিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা। তাঁদের দাবি, পাঁচজন বা তার কমসংখ্যক শিক্ষক কর্মরত থাকলে বদলির সুযোগ নেই। নতুন শিক্ষক দিয়ে প্রতিস্থাপন না করে এমন বিদ্যালয় থেকে বদলির আদেশ দেওয়া অনিয়মের শামিল। এ ঘটনায় মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন বঞ্চিত শিক্ষকরা।

তবে এ বিষয়ে ইউএনও মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘ওখানে বদলি করা হয়েছে, কারণ ওখানে যে কয়জন শিক্ষক দেওয়া আছে, সে কয়জন শিক্ষক দেওয়া হবে।’

চিলমারীর মুদাফৎ কালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও শিক্ষক সংকটের মধ্যে বদলি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিদ্যালয়টিতে ১৫২ জন শিক্ষার্থী এবং ছয়টি অনুমোদিত পদ থাকলেও কর্মরত ছিলেন মাত্র দুইজন শিক্ষক।

বদলি তালিকার ১১ নম্বর ক্রমিকে থাকা মোছা. মাসুমা আক্তারকে ওই বিদ্যালয় থেকে মুদাফৎথানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। ফলে বদলির পর মুদাফৎ কালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেড় শতাধিক শিক্ষার্থীর পাঠদানের দায়িত্বে একজন শিক্ষক থাকছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে মাসুমা আক্তার মাতৃত্বকালীন ছুটিতে ছিলেন।

মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা অবস্থায় বদলি করা যায় কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ইউএনও মাহমুদুল হাসান বলেন, ওই শিক্ষকের ক্ষেত্রে মানবিক দিক বিবেচনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘তাকে এখন যদি বদলি না করা হয়, তাহলে আর বদলি হতে পারবেন না।’

অথচ বদলি নীতিমালা অনুযায়ী, আবেদনের ভিত্তিতে প্রতি মাসে কমিটির সভা করে শিক্ষক বদলির সুযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এরপরও মানবিক কারণ দেখিয়ে বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষক সমাজ।

চর মুদাফৎ কালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জিয়ারা খাতুন বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতিস্থাপন ছাড়া বদলির কোনো নিয়ম নেই। কোনো স্কুলে বদলি করতে গেলে অবশ্যই নতুন শিক্ষক দিয়ে বদলি করতে হবে। আর প্রতিস্থাপন ছাড়া বদলি শুধু সচিবালয় ও দপ্তর করতে পারে। ডিডি বা ডিপিইওর করার ক্ষমতা নেই। সেখানে একজন ইউএনও কীভাবে করেন? এখানে সিন্ডিকেট করে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বদলি করানো হয়েছে।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন