নেত্রকোনার মদন উপজেলার বাগজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রক্ষায় নদীভাঙন প্রতিরোধে বাস্তবায়িত জরুরি প্রতিরক্ষা কাজ নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রাক্কলন ও নকশা অনুযায়ী সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তবে এ প্রকল্প নিয়ে বারবার নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশের ফলে জনমনে অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তির সৃষ্টি হচ্ছে।
গত ৮ অক্টোবর দৈনিক ইত্তেফাক, যায়যায়দিনসহ কয়েকটি গণমাধ্যম ও অনলাইন পোর্টালে নেত্রকোনায় নদীভাঙন রোধ প্রকল্পে ‘সাগর চুরির’ অভিযোগ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদনে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগকে অসত্য, ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছেন এলাকাবাসী ও প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৯ লাখ ৮২ হাজার ২৮২ টাকা ব্যয়ে ৮০ মিটার দীর্ঘ জরুরি প্রতিরক্ষা কাজটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনুমোদিত প্রাক্কলন ও ডিজাইন অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কাজ শেষ হওয়ার পর বিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিবেশ ও নদীতীরের পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। এর ফলে দীর্ঘদিনের নদীভাঙনের তীব্র ঝুঁকি থেকে বিদ্যালয়টি এখন সুরক্ষিত রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি আব্দুল লতিফ বলেন, কাজ চলাকালে বিভিন্ন সময় কিছু সাংবাদিক বিদ্যালয় এলাকায় এসে নানা বিষয়ে বিরক্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি করতেন। তাদের আচরণে স্থানীয় লোকজন বিরক্ত হয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
প্রকল্পের কাজে ১৩টি কাঠের বল্লার পরিবর্তে মেহগনি গাছের ডাল ব্যবহারের অভিযোগ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, নির্ধারিত প্রজাতির কাঠ স্থানীয় বাজারে সহজলভ্য না থাকায় সংশ্লিষ্টদের অনুমতি নিয়েই বিকল্প টেকসই কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে। এতে প্রকল্পের কার্যকারিতা বা মানে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি।
এছাড়া জিও-ব্যাগে শুকনো বালুর পরিবর্তে ভেজা বালু ব্যবহারের অভিযোগও সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের ভাষ্য, নদীর পাড়ে কাজ করার সময় বালুতে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা আর্দ্রতা থাকে। তবে জিও-ব্যাগের ওজন নির্ধারণের সময় প্রয়োজনীয় মান পুরোপুরি বজায় রাখা হয়েছে। স্থানীয় ইউপি সদস্যসহ অন্যদের উপস্থিতিতে ওজন যাচাইয়ের সময় প্রতিটি ব্যাগের ওজন ২৮০ থেকে ৩০০ কেজি পর্যন্ত পাওয়া গেছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল্লাহ বলেন, কাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমি উপস্থিত ছিলাম। আমার সামনেই কাজ হয়েছে, কোনো ধরনের অনিয়ম আমার চোখে পড়েনি। কিছু সাংবাদিক মাঝেমধ্যে এসে বিভিন্ন অজুহাতে বিরক্ত করতেন। তাদের উদ্দেশ্য হাসিল না হওয়ায় হয়তো এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকও তাঁর বক্তব্যের একটি অংশ সংবাদে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়নি বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, কিছু সাংবাদিক আমাকে বারবার ফোন করে তাদের জন্য কিছু করার কথা বলতেন। আমার বক্তব্য যেভাবে প্রকাশ করা হয়েছে, সেটি আমার সম্পূর্ণ বক্তব্য নয়; বরং আমার বক্তব্যের একটি অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট উজ্জ্বল তালুকদার বলেন, একজন ঠিকাদারের পক্ষে জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অমান্য করে কিংবা প্রাক্কলন গোপন রেখে কাজ করার কোনো সুযোগ নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ডের চূড়ান্ত পরিমাপ ও যাচাই-বাছাইয়ের পরই বিল পরিশোধ করা হয়।
মদন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রতিনিধি মো. সুজন জানান, আমি নিয়মিত প্রকল্প এলাকায় এসে কাজের তদারকি করেছি। আমার পর্যবেক্ষণে কাজের মধ্যে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা দেখতে পেয়েছি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, কাজটি শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। স্থানীয় লোকজন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রতিনিধি, বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও দপ্তরীসহ সংশ্লিষ্টরা কাজটি সার্বক্ষণিকভাবে মনিটরিং করেছেন। অথচ বারবার নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশ করে আমাকে হেয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সংবাদে দেখলাম আমাকে উদ্দেশ্য করে লেখা হয়েছে যে আমি ফোন রিসিভ করিনি। অথচ ওই সময়ে আমাকে কেউ ফোনই করেননি। উন্নয়নমূলক কাজে এভাবে বাধা সৃষ্টি করা সত্যিই হতাশাজনক। এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার আরও বেশি দায়িত্বশীল হওয়া উচিত।
এলাকাবাসীর দাবি, বাগজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নদীভাঙনের ঝুঁকি থেকে রক্ষায় বাস্তবায়িত কাজটি সরেজমিন যাচাই না করেই একপাক্ষিকভাবে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। বিদ্যালয় রক্ষায় বাস্তবায়িত এই উন্নয়নকাজকে অযথা বিতর্কিত না করে প্রকল্পের বাস্তব অবস্থা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং স্থানীয় সাধারণ মানুষের মতামত বিবেচনায় নিয়ে দায়িত্বশীল সংবাদ প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

