ধেয়ে আসছে ভারতীয় ঢল নিম্নাঞ্চল প্লাবিত

লালমনিরহাট ও হাতীবান্ধা প্রতিনিধি

ধেয়ে আসছে ভারতীয় ঢল নিম্নাঞ্চল প্লাবিত

ভারতের ঢল আর বৃষ্টিপাতের প্রভাবে তিস্তা নদীর পানি হু-হু করে বাড়ছে। এতে লালমনিরহাট জেলার বিভিন্ন এলাকার নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চল এবং চরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় পানি উঠতে শুরু করেছে। তলিয়ে যাচ্ছে ফসলি জমি।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে তিস্তা নদীর পানি প্রায় ৮০ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার কাছাকাছি ওঠানামা করছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, তিস্তা নদীর পানি শুক্রবার সকাল ৬টায় ডালিয়া ব্যারাজ পয়েন্টে ৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও বৃহস্পতিবার রাতভর বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তিস্তার পানি বাড়ায় সদর উপজেলার কালমাটি, খুনিয়াগাছ; আদিতমারী উপজেলার মহিষখোঁচা, গোবর্ধন, সর্দারপাড়া; কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী, কাকিনা; হাতীবান্ধা উপজেলার সানিয়াজান, গড্ডিমারী, পাটিকাপাড়া, সিংগীমারী ও সিন্দুর্না ইউনিয়ন এলাকার নদীর কোলঘেঁষে বসবাসরত পরিবারগুলো পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এদিকে পানির প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাটের সবগুলো খোলা রয়েছে। দেশে এবং উজানে ভারতের বিভিন্ন এলাকায় ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টির কারণে নদীটিতে পানি থেমে থেমে বাড়ছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

পানি উন্নয়ন বোর্ড লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী শুনীল কুমার বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বরাত দিয়ে জানান, উত্তরাঞ্চল এবং তৎসংলগ্ন উজানে মাঝারি থেকে ভারি এবং কতিপয় স্থানে অতি ভারি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে, এই সময়ে দেশের উত্তরাঞ্চলের তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার ইত্যাদি নদ-নদীর পানি সমতল সময় বিশেষে দ্রুত বাড়তে পারে এবং তিস্তা নদীর কতিপয় পয়েন্টে স্বল্পমেয়াদে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। তিনি আরো বলেন, বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় তিস্তার পানি বিপৎসীমার তিন সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

এতে নদীতীরবর্তী এলাকায় আবার স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, বৃহস্পতিবার রাতভর তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপরে ছিল। শুক্রবার সকালে পানির প্রবাহ কিছুটা কমে গিয়ে বিপৎসীমার ৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে তিনি জানান। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, তিস্তার পানি আবার যেকোনো সময় বিপৎসীমা অতিক্রম করে লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রামের নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। ভারত থেকে বৃহস্পতিবার রাতভর প্রবল গতিতে তিস্তার পানি ধেয়ে আসা নদীতীরবর্তী এলাকার মানুষজন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে বলে জানা গেছে।

নদীপাড়ের অধিবাসীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই ভারত নিয়ন্ত্রিত গজলডোবা ব্যারেজের গেট খুলে দিয়ে আমাদের পানিতে ভাসিয়ে দেয়। তাদের খেয়াল-খুশিমতো গেটটি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে ভারত। তিস্তা নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দা মকবুল হোসেন বলেন, বন্যা, খরা এবং নদীভাঙনের কবলে পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে আমরা এখন নিঃস্ব। আর বন্যার মৌসুম এলেই আমাদের চোখে ঘুম থাকে না, কখন যে ভারত পানি ছেড়ে দিয়ে আমাদের ঘরবাড়ি ডুবিয়ে দেয়। পানি ছেড়ে দেওয়ার আগে পূর্ব ঘোষণার দাবি জানান। তিস্তাপাড়ের সাবেক স্কুল শিক্ষিকা বিলকিস বেগম বলেন, ‘অনেকে অনেক আশার বাণী শুনিয়েছিলেন তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ব্যাপারে, কিন্তু আজ পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি আমরা দেখছি না।’ তিনি অতি দ্রুত তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু করার দাবি জানান।

হাতীবান্ধা (লালমনিরহাট) প্রতিনিধি জানান, ভারতের টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর পানি বেড়ে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তাতীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলে পানি ঢুকে ফসলের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে পানির প্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ১৮ মিটার, যা বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর আগে সন্ধ্যা ৬টায় পানির স্তর বিপৎসীমার ১ সেন্টিমিটার নিচে ছিল।

পানি বাড়ায় উজানের চাপ সামাল দিতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গড্ডিমারী, দোয়ানী, সানিয়াজান, সিঙ্গিমারী, সিন্দুর্না ও ডাউয়াবাড়ি ইউনিয়নের তিস্তাতীরবর্তী চরাঞ্চলের বাদামক্ষেত, ধানের বীজতলা, মিষ্টিকুমড়াসহ বিভিন্ন কৃষিজমিতে ইতোমধ্যে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে।

তিস্তার ডালিয়া পয়েন্টের পানি পরিমাপক নুরুল ইসলাম জানান, গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই নদীর পানি বাড়তে শুরু করে। রাত ৯টায় তা বিপৎসীমার তিন সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় ব্যারাজের সবগুলো, অর্থাৎ ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন