শীতে পরাজিত একটি জনপদ কুড়িগ্রাম। হিমালয়ের খুব কাছাকাছি হওয়ায় এ জেলার উপর দিয়ে বইতে শুরু করেছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। দুপুর গড়িয়ে গেলেও দেখা মিলছেনা সূর্যের। উত্তরের হিমেল হাওয়া সেই সাথে বৃষ্টির মতো কুয়াশায় কুড়িগ্রামের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। রাত যত গভীর হচ্ছে শীতের পরিমাণ তত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কুড়িগ্রামে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের বসবাস যার একাত্তর শতাংশ মানুষ দরিদ্র ও হতদরিদ্র। জীবিকার তাগিদে কর্মের খোঁজে তাদের ছুটতে হয় দেশের বিভিন্ন জেলায়। ছেলে-মেয়েদের খাবারের যোগান দেওয়ার পাশাপাশি চলতি শীত মৌসুমে শীতবস্ত্র কেনা তাদের কাছে যেনো আকাশকুসুম কল্পনা।
রাজিবপুর উপজেলার কোদালকাটি ইউনিয়নের দিনমজুর হাবিল মিয়া বলেন, ‘অন্যের জমিতে দিন মজুরি করে যা উপার্জন হয় তাই দিয়ে সংসার চালাই।। যে শীত পড়েছে ক্ষেতে কাজই করতে পারছিনা। ঠান্ডা বাতাসে অবস্থা একদম শোচনীয়। কাজ বাদ দিয়ে বসে আছি।
কুড়িগ্রামের চারশোটি চরে প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জেলা সদর কিংবা উপজেলায় আসার একমাত্র বাহন হচ্ছে নৌকা। সকালে ঘাট থেকে নৌকা গুলো ছাড়লে দিক ভুলে অন্যত্র চলে যায়। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়ে নৌকায় থাকা জনগন।
নৌকার মাঝি আলম মিয়া বলেন, নদীতে পানি কমে আসার কারণে অনেক ঘুরে আসতে হয়, তার উপর অতিরিক্ত কুয়াশায় সামনের কিছুই দেখা যায় না। রওয়ানা দেই চিলমারী ঘাটের উদ্দেশ্য, দুই ঘন্টা পর দেখি নৌকা রাজিবপুর চলে গেছে। যাত্রীদের তো অনেক দরকারি কাজ থাকে, তারা খুব ভোগান্তিতে পড়ে।
অতিরিক্ত কুয়াশায় ধীরগতিতে চলছে দূরপাল্লার গাড়ি। এতে করে সময় নষ্ট হচ্ছে যাত্রীদের। হেড লাইট জ্বালিয়ে চলাচল করলেও প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। চালকরা জানান, মহাসড়কে হেডলাইট জ্বালিয়ে গাড়ি চালাতে হচ্ছে। অনেক সময় রাস্তা ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না ফলে নানা রকম দুর্ঘটনা ঘটছে।
হাড় কাঁপানো কনকনে ঠান্ডায় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শীত নিবারনের জন্য শহরের নিম্ন আয়ের মানুষের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে ফুটপাতের কমদামি জামা-কাপড়ের দোকানগুলো।
দুস্থ ও প্রান্তিক পর্যায়ের খেটে খাওয়া মানুষগুলো শীত উপেক্ষা করে কাজে যোগ দেওয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে শীতজনিত নানা রোগে।
কুড়িগ্রাম সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা গেছে, শুধুমাত্র ডিসেম্বর মাসেই জেলার ৯ টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শীতে আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ৪শ ডায়রিয়ার রোগী ভর্তি হয়েছে। এছাড়াও জ্বর, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে আরো প্রায় ৩ হাজার রোগী, যেখানে শিশু ও বয়স্কদের সংখ্যাই বেশি।
জেলা সিভিল সার্জন অফিস চলতি শীত মৌসুমে শিশু ও বয়স্কদের ব্যাপারে আলাদা যত্নবান হওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন।
যাত্রাপুর চরের বাসিন্দা রমেছা বেগম বলেন, ‘বেড়ার ফাঁক দিয়ে ঘরে বাতাস ঢোকে। ঠান্ডায় সারারাত ঘুমাতে পারি না, মনে হয় অজ্ঞান হয়ে যাবো। পুরান একটা কম্বল দিয়ে শীত যায় না। কতোজন কম্বল পায় আমরা তো পাই না বাবা। ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে কষ্টে আছি।’
কুড়িগ্রাম পৌর এলাকার রিকশা চালক মাহবুর রহমান বলেন, ‘পেটের দায়ে সকালে বের হই কিন্তু প্রচন্ড শীত আর বাতাসে গাড়ি চালানো যায় না। অতিরিক্ত শীতের কারণে যাত্রীও কম। বাতাসে হাত-পা অবস হয়ে আসে।’
কুড়িগ্রাম কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র জানান, ‘কুড়িগ্রামে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়েছে। শনিবার (৩ জানুয়ারি) জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯৯ শতাংশ। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে তাপমাত্রা আরো কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।’
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আব্দুল মতিন বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে জেলার শীতার্ত মানুষের মধ্যে ২৭ হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়াও এখন পর্যন্ত কুড়িগ্রামের ৯টি উপজেলায় ৬ লক্ষ করে টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

