আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

লালমনিরহাটে বিষবৃক্ষ তামাক চাষ বেড়েছে দ্বিগুণ

হাসান উল আজিজ, লালমনিরহাট

লালমনিরহাটে বিষবৃক্ষ তামাক চাষ বেড়েছে দ্বিগুণ

বিষবৃক্ষ তামাক চাষে পাঁচ বছরের রেকর্ড ভাঙল লালমিনরহাট। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে বিষবৃক্ষ তামাক চাষ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ।

জমির উর্বরতা, পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও মাটির গুণাগুণের মারাত্মক ক্ষতির বিষয়টি জেনেও কোনোভাবেই থামছে না যেন তামাক চাষের আগ্রাসন। স্থানীয় সচেতন কৃষকরা বলছেন, কৃষি বিভাগের উদাসীনতা, উৎপাদনের আগে কোম্পানির তামাকের দর নির্ধারণ, বিক্রয়ের নিশ্চয়তা, চাষের জন্য সুদমুক্ত ঋণ, কোম্পানির প্রতিনিধিদের নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন, পরামর্শ ও প্রতিবছরে তামাকের দাম বৃদ্ধির কারণে তামাক চাষে ঝুঁকে পড়েছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা।

বিজ্ঞাপন

লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ জেলায় ২০২০-২১ অর্থবছরে সাত হাজার ৪০০ হেক্টর, ২০২১-২২ অর্থবছরে সাত হাজার ৫৫০ হেক্টর, ২০২২-২৩ অর্থবছরে সাত হাজার ৪৪০ হেক্টর, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নয় হাজার আট শত ৬৫ হেক্টর ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫ হাজার ৫৭ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ করা হয়েছে। অথচ বিগত পাঁচ বছরের তুলনায় এবার তামাক চাষ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ।

জানা গেছে, দেশের উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাটের জেলার ৮০ ভাগ মানুষ কৃষি কাজের উপর নির্ভরশীল। বিগত বছর গুলিতে এ জেলায় প্রচুর পরিমাণে ধান, গম,

সরিষা, ভুট্টা, আলু, আখ, বেগুন, লাউ, শিম, মুলা ও কপিসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি ব্যাপক ভাবে উৎপাদিত হতো। কিন্তু সবজি চাষে টানা কয়েক বছর ধরে লোকসান গুণে

কৃষকরা আগ্রহ হারাচ্ছে। সরকারের কৃষি বিভাগের প্রয়োজনীয় পরামর্শ না পেয়ে সবজি চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে কৃষকরা। ফলে জেলা সদরের তিস্তা থেকে বুড়িমারী

পর্যন্ত বিষবৃক্ষ তামাক ছড়িয়ে পড়েছে। কৃষি বিভাগের দায়িত্বের অবহেলার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তামাক কোম্পানিগুলো চালিয়ে যাচ্ছে তাদের কার্যক্রম। কৃষকদের তামাক চাষের

প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণসহ বিনামূল্যে তামাকের বীজ, সহজ শর্তে ঋণ, সার, কীটনাশক ও নগদ অর্থ প্রদান করছে। এমনকি প্রতিবছরে লোভনীয় অফার সহ তামাকের দাম বৃদ্ধি করায়

পুরো পরিবার তামাক ক্ষেতে কাজ করছে মা-শিশু, বৃদ্ধ সহ বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষরা। তামাক চাষের কারণে কৃষি পরিবারের সদস্যরাও সবসময় স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকেন।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার রাজপুর ইউনিয়নের চরাঞ্চলের তামাক চাষি বাহার উদ্দিন ও আব্দুর রহমান জানান, তামাক কোম্পানিগুলোর নিয়োগকৃত সুপারভাইজাররা প্রতিনিয়ত মাঠে

গিয়ে চাষীদের পরামর্শ প্রদান করছেন। বাজারে তামাকের যথেষ্ট চাহিদা থাকায় বিক্রি করতে ঝামেলা হয় না কৃষকদের। কৃষকদের সুবিধার জন্য কোম্পানিগুলো এ জেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে তুলেছেন বড় বড় অনেক ক্রয় কেন্দ্র ও গোডাউন। মূলত কৃষকদের যাবতীয় সমস্যার ব্যাপারে সর্বদাই সজাগ এসব কোম্পানি। তারা নিজেদের চাষি হিসেবে কৃষকদের মধ্যে কৃষক কার্ড বিতরণ করেছে। ফলে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নয় হাজার আট শত ৬৫ হেক্টর জমিতে বিষবৃক্ষ তামাক চাষাবাদ হলেও চলতি অর্থবছরে ১৫ হাজার ৫৭

হেক্টর জমিতে তামাক চাষ করা হচ্ছে। এতেকরে বিষবৃক্ষ তামাক চাষে পাঁচ বছরের রেকর্ড ভাঙলো লালমিনরহাট। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে বিষবৃক্ষ তামাক চাষ বেড়েছে

প্রায় দ্বিগুণ। এতে জেলার খাদ্যশস্য ঘাটতির পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে জমির উর্বরতা শক্তি। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ বলেছে,তামাক চাষ ও সেবন মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তামাক

পাতার বিড়ি,সিগারেট, গুল,খইনি, ও জর্দাসহ নানান ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্যে সেবন করায় বাড়ছে শ্বাসকষ্ট চর্মরোগ, ক্যানসার নানা রকম জটিল রোগ। সরেজমিনে দেখা যায়,

লালমনিরহাট জেলার পাঁচটি উপজেলাসহ তিস্তা নদীর প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের জমিগুলোতে দিন দিন বেড়েই চলেছে তামাক চাষ।নারী, পুরুষ ও শিশুদের নিয়ে চলছে পরিচর্যা। শুষ্ক মৌসুমে

নদীর বুক জেগে ওঠা চরের হাজার হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ হওয়া ফসলের মধ্যে অন্যতম বড় একটি অংশই হলো তামাক।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন,কৃষি বিভাগের উদাসীনতা, তামাক উৎপাদনের আগে কোম্পানিগুলোর দর নির্ধারণ, বিক্রির নিশ্চয়তা, চাষের জন্য সুদমুক্ত অগ্রিম টাকা প্রদান, কোম্পানির প্রতিনিধিদের

নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন ও পরামর্শদান তামাক চাষ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ । কয়েক বছর আগেও লালমনিরহাটের যে সব আবাদি জমিতে ধান, ভুট্টা,সরিষা, আলুসহ

বিভিন্ন ফসল চাষ করা হয়েছে সেসব জমিতে এখন চাষ করা হচ্ছে তামাক। তামাকজাত কোম্পানিগুলোর প্রলোভনে ও অধিকহারে মুনাফা লাভের আশায় তামাক চাষে

আগ্রহী হয়ে উঠেছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা । ফলে অধিক লাভের আশায় স্বাস্থ্যঝুঁকি মাথায় নিয়েই ঝুঁকে পড়েছেন তামাক চাষের দিকে।

আদিতমারী উপজেলার সাপ্টিবাড়ী ইউনিয়নের সারাপুকুর এলাকার তামাক চাষি খোরশেদ আলম (৬৫) বলেন, বাহে হামরাগুলা মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবার। আলু চাষ করার খরচ আমাদের

হাতে নেই। এ অবস্থায় তামাক কোম্পানিগুলো বিনামূল্যে তামাকের বীজ, ঋণ, সার, কীটনাশক দিয়ে সহযোগিতা করায় দুই বিঘা জমিতে তামাক চাষ করেছি। আমরা শুধু

তামাক ক্ষেতে শ্রম দিচ্ছি। তামাকের ক্ষেত ভাল হয়েছে। কোম্পানির ঋণ পরিশোধ করেও ভালো লাভের আশা করছি।

তামাকের ইউনিয়ন নামে পরিচিত সাপ্টিবাড়ী ও সারপুকুর এলাকার তামাক চাষী মশিয়ার, কোরবান, গোলাম মিয়া, তসর উদ্দিনসহ অনেকেই বলেন, জেলার পাঁচটি উপজেলার মধ্যে

সবচেয়ে আদিতমারী উপজেলার সাপ্টিবাড়ী ও সারপুকুর ইউনিয়নে তামাকের চাষ বেশি হয়। এলাকায় বেশ কয়েকটি তামাক কোম্পানির কার্যালয় রয়েছে। তারা সাধারণের সহযোগিতা

করায় প্রতিবছরেই তামাক চাষ করছি। অধিক মুনাফার আশায় কৃষকরা তামাক চাষে আগ্রহী হচ্ছেন বলে জানান তিনি।

লালমনিরহাট সিভিল সার্জন নির্মলেন্দু রায় সাংবাদিকদের বলেন, তামাক চাষ ও সেবন মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তামাক পাতার বিড়ি, সিগারেট, গুল, খইনি ও জর্দাসহ

নানান ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করায় বাড়ছে শ্বাসকষ্ট, স্টক, চর্ম , যৌন, ক্যানসারসহ নানা রোগ। তামাক চাষের কারণে কৃষকদের পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন মা

ও শিশুসহ সাধারণ মানুষ।

এ বিষয়ে লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. সাইখুল আরিফিন সাংবাদিকদের বলেন, কৃষি জমি এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য তামাক চাষ মারাত্মক ক্ষতিকর।

আমাদের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সভা সেমিনার ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে কৃষকদের তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। কিন্তু চাষীরা অধিক মুনাফার

আশায় তামাক চাষে ঝুঁকে পড়েছে।

এমএস

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...