গাইবান্ধার ফুলছড়ি-বাহাদুরাবাদ ঘাটে ২৫ বছর ধরে ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে এই নৌরুটে কোটি মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন । এই দুর্ভোগ নিরসনে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের দাবি দিন দিন জোরালো হচ্ছে। দাবি আদায়ের লক্ষ্যে নদীর দুই পাড়ের মানুষ সভা, সমাবেশ, মানববন্ধনসহ জনমত সৃষ্টিতে নানা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এ দাবি বাস্তবে রূপ দিতে সাঘাটা ও ফুলছড়ির ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ইতোমধ্যেই উত্তরের জেলাগুলোতে সফর করে জেলা প্রশাসন, প্রেস ক্লাবসহ বিভিন্ন মহলে সেতু নির্মাণের যৌক্তিকতা তুলে ধরছেন।
গাইবান্ধার ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা বেষ্টিত মানুষ অসহনীয় কষ্টে বালাসী-বাহাদুরাবাদ ঘাট পাড়ি দিয়ে যাতায়াত করেন।
ফুলছড়ি উপজেলার এপারে বালাসী ঘাট থেকে ওপারে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত যাতায়াতের একমাত্র ভরসা নৌযান। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ নদী পারাপার হন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। মানুষের অতিরিক্ত ভিড়, প্রতিকূল আবহাওয়া ও নদীর প্রবল স্রোত কখনো কখনো যাত্রাকে অনিরাপদ করে তোলে। তবু নিরুপায় হয়ে এ অঞ্চলের মানুষ ঝুঁকি নিয়েই এ পথে যাতায়াত করে।
একসময় ফুলছড়ি ঘাট থেকে ওপারে বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত রেলওয়ের ফেরি চলাচল করত। ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানাভাবে দুই পাগে জমজমাট পরিবেশ ছিল।
নদীর নাব্য সংকটসহ নানা কারণে প্রায় ২৫ বছর ধরে ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। তখন থেকেই এই দীর্ঘ পথে নৌকা চলাচল করে। অতি কষ্টে ভোগান্তির শিকার হয়ে দুই পাড়ের মানুষ যাতায়াত করেন। নদী পারাপারের এই দুর্ভোগ শুধু সাধারণ মানুষের নয়, প্রভাব ফেলছে কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতেও। এই এলাকার উৎপাদিত পণ্য সহজে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছানো অত্যন্ত বিলম্ব কষ্টসাধ্য। এতে কৃষকরা তাদের ন্যায্য দাম থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
ভরতখালী এলাকার ব্যবসায়ী শওকত মির্জা রুস্তম বলেন, ‘বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার অত্র এলাকায় টালেল নির্মাণের নামে মানুষকে মিথ্যা স্বপ্ন দেখিয়ে গেছে। যা বাস্তবায়নে কোনো ধরনের কাজ করেনি তারা। এই এলাকায় একটি সেতু নির্মাণ হলে মানুষের জীবনের মান বেড়ে যাবে। ব্যবসায় প্রসার ঘটবে। তাই সেতু নির্মাণ এখন এ অঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবি।’
অপরদিকে বালাসী-বাহাদুরাবাদ ঘাটে সেতু না থাকায় গাইবান্ধার ফুলছড়িতে ব্রহ্মপুত্র পারাপারে দুর্ভোগের শেষ নেই চরাঞ্চলের মানুষের। প্রতিদিন চরম দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে । শুধু তাই নয়, ভালো ঘরে বিয়ে হয় না চরাঞ্চলের মেয়েদের । এই সমস্যা নিরসনে নেওয়া হচ্ছে না জোরালো উদ্যোগ । ফলে এই নদীপথে কোটি মানুষের ভোগান্তি দিনদিনই বাড়ছে ।
জানা গেছে, গাইবান্ধার ফুলছড়িতে ব্রহ্মপুত্র নদে মাত্র কয়েক মিনিটের নদী পাড়ি দিতে যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগে আর এই নদীপথে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে নৌকায় যাতায়াত করছেন গাইবান্ধার বালাসী-বাহাদুরাবাদ নৌপথের দুই পাড়ের বাসিন্দারা। এটি উত্তরাঞ্চল তথা গাইবান্ধাবাসীর প্রতিদিনের বাস্তব চিত্র। যখন উন্নয়নের মহাসোপানে দেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তখন গাইবান্ধার নদীভাঙন, চরাঞ্চল ও দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে এখানকার মানুষ উন্নয়নের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে।
ব্রহ্মপুত্র আর যমুনা এখানে শুধু একটি নদী নয়, এটি যেন মানুষের স্বপ্ন আর সম্ভাবনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা গাইবান্ধা তথা উত্তরের উন্নয়নের এক বিশাল বাধা।
বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ মানুষ এই নদী পাড়ি দেওয়ার দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। কখনো নৌকার জন্য অপেক্ষা। অনেক সময় প্রতিকূল আবহাওয়া, কখনো হাজারো ডুবোচর সব মিলিয়ে কয়েক মিনিটের দূরত্ব পরিণত হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টার বিড়ম্বনায়।
ফুলছড়ির গজারিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ওয়াজেদ আলী মুন্সি বলেন, চরে বাস করি। এখানে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল নেই, যেতে হয় জেলা বা দূরের শহরে । অনেক সময় ডেলিভারি রোগী হাসপাতালে পৌঁছার আগেই মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
বালাসীর সাত্তারকান্দির বাসিন্দা জসিজল হক বলেন, পোলাপান নৌকায় করে স্কুলে যেতে চায় না। বর্ষায় নৌকা চলে, অধিকাংশ সময় হাঁটা পথে চলতে হয়। ভালো ঘরে বিয়ে সাদি হয় না আমাগোর মেয়ের। সবচেয়ে কষ্ট তাদের, যাদের হাতে সামর্থ্য কম। নদীর ঘাটে অপেক্ষমাণ মানুষটির মুখে অভিযোগের অন্ত নেই ।
ফুলছড়ি উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলাম বলেন, এই নৌপথে একটি সেতু বদলে দিতে পারে পুরো উত্তরাঞ্চলের চিত্র। এই দীর্ঘদিনের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের অন্যতম কার্যকর পথ হতে পারেÑএই নৌঘাট থেকে বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত একটি সেতু নির্মাণ। এটি শুধু একটি সেতু হবে না, এটি হবে উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের যোগাযোগ, অর্থনীতি ও সম্ভাবনার সঙ্গে নতুন করে সংযোগ স্থাপনের একটি ঐতিহাসিক দ্বার।
সম্পাদনা//বুলবুল
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

