দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে সাজানো নির্বাচন, রাতের ভোট আর ক্ষমতাকেন্দ্রিক এমপি তৈরির রাজনীতির পর রংপুরে ফিরছে ভোটের উত্তাপ। ‘নতুন বাংলাদেশে’ স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রত্যাশায় রংপুরের ছয়টি সংসদীয় আসনের প্রায় ২৬ লাখ ভোটার এবার ব্যালটের মাধ্যমে নিজেদের মত প্রকাশে প্রস্তুত। শহর থেকে গ্রাম—চায়ের দোকান, হাট-বাজার আর পাড়া-মহল্লায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন একটাই— রংপুর থেকে কারা যাবে সংসদে?
রংপুরের সংসদীয় ছয়টি আসনে কখনো বিএনপি কিংবা জামায়াতে ইসলামী থেকে কেউ এমপি নির্বাচিত হননি। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও তাদের দোসর জাতীয় পার্টি থেকেই সব সময় এমপি নির্বাচিত হয়েছিল। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর আওয়ামী লীগের এমপিদের কেউ জেলে, কেউ পলাতক। আর জাতীয় পার্টির এমপিরা তোপের মুখে পড়ার ভয়ে অধিকাংশই আত্মগোপনে।
এখন মাঠে চষে বেড়াচ্ছেন বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মনোনীত প্রার্থীরা। তারেক জিয়ার ইমেজ ও আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংকের ওপর ভিত্তি করে নির্বাচিত হতে চাযন বিএনপির প্রার্থীরা। অপরদিকে শক্ত অবস্থান নিয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন জামায়াতের প্রার্থীরা। তাদের ভরসার জায়গা তরুণ ও নারী ভোটার। এদিকে জুলাই অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখায় জয়ের স্বপ্ন দেখছেন এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আখতার হোসেন। অপরদিকে জাতীয় পার্টিও উঁকি মারছে ভোটের মাঠে। তবে ভোটাররা পরিবর্তনের পক্ষে।
রংপুর ১ (গঙ্গাচড়া ও সিটি করপোরেশনের আংশিক)
এ আসনে বিএনপির টিকিট পেয়েছেন একসময়ে দল থেকে বহিষ্কৃত নেতা মোকাররম হোসেন সুজন। এখন তিনি বিভক্ত নেতাকর্মীদের নিয়ে জয়ের আশায় ভোটের মাঠে। জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে অনেক আগে থেকে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন মাওলানা রায়হান সিরাজী। এই আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী দ্বৈত নাগরিক হওয়ায় তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।
এছাড়া এ আসনে আরো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের এ টি এম গোলাম মোস্তফা বাবু, গণঅধিকার পরিষদের হানিফুর রহমান সজীব, বাসদের (মার্কসবাদী) আহসানুল আরেফিন তিতু, জাতীয় নাগরিক পার্টির আল মামুন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের মমিনুর রহমান, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মোহাম্মদ আনাস।
রংপুর ২ (বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জ)
বিএনপি থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে জাপা থেকে যোগ দেওয়া মোহাম্মদ আলী সরকারকে। তাকে মনোনয়ন দেওয়ায় স্থানীয় বিএনপি ঝাড়ু ও মশাল মিছিল করে তার মনোনয়ন বাতিল চেয়েছেন। এর পরেও তাকেই ধানের শীষ দেওয়ায় দলীয় নেতাকর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। অন্যদিকে এ আসনে হেভিওয়েট প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম। তিনি দীর্ঘ সাড়ে ১৩ বছর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের মিথ্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডাদেশ নিয়ে কারাগারে ছিলেন। অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে তিনি এই আসনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন তিনি। এদিকে জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন আনিসুল ইসলাম মণ্ডল। এই আসনে অন্য বৈধ প্রার্থীরা হলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা আশরাফ আলী ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির আজিজুর রহমান।
রংপুর ৩ (সিটি করপোরেশন-আংশিক ও সদর)
বিভাগীয় শহর হওয়ায় এই আসনটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বিএনপি থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক শামসুজ্জামান সামুকে। তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন এবং বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তা বিপ্লব কুমার সরকারসহ আওয়ামী লীগের কয়েকজনকে ভারতে যাওয়ার জন্য বর্ডারে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে। তবে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এ আসনে ভালো অবস্থানে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বেলাল। তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে এর আগে থেকে ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাচ্ছেন। এই আসনে জাতীয় পার্টি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দলটির চেয়ারম্যান জিএম কাদের। এ আসন জাতীয় পার্টির দুর্গ হলেও খুনি হাসিনার পক্ষ নিয়ে ছাত্র-জনতার বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ায় জিএম কাদেরের বিপক্ষে সাধারণ মানুষ। এই আসনে অন্য বৈধ প্রার্থীরা হলেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমিরুজ্জামান পিয়াল, বাসদের আব্দুল কুদ্দুস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নুর আলম সিদ্দিক ও স্বতন্ত্র প্রার্থী তৃতীয় লিঙ্গের আনোয়ারা ইসলাম রানী।
রংপুর-৪ (পীরগাছা ও কাউনিয়া)
এখানে বিএনপি থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে শিল্পপতি এমদাদুল হক ভরসাকে। মনোনয়ন পাওয়ার পর আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করার ব্যাপারে তার একটি বক্তব্য ভাইরাল হলে এলাকায় তিনি বিতর্কিত হয়ে পড়েন। এরপরেও তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে জয়ী হওয়ার জন্য মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। এ আসনে আরেক শক্তিশালী প্রার্থী এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক জুলাই যোদ্ধা আখতার হোসেন। তরুণ ভোটাররা তার জন্য ভোটারদের বাড়ি বাড়িতে গিয়ে ভোট চাচ্ছেন। আখতারকে সমর্থন করে জামায়াত নিজেদের কোনো প্রার্থীকে এ আসনে মনোনয়ন দেয়নি। এখানে জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান। এ আসনে প্রার্থীর তালিকায় আরো আছেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা মুহাম্মাদ জাহিদ হাসান, বাসদের (মার্কসবাদী) প্রগতি বর্মন তমা, বাংলাদেশ কংগ্রেসের উজ্জ্বল চন্দ্র রায়, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আবু সাহা।
রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর)
এই আসনে জামায়াত থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় শূরা কমিটির সদস্য অধ্যাপক গোলাম রব্বানীকে। তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ভোটারদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে দাঁড়িপাল্লায় ভোট চাচ্ছেন। এখানে বিএনপি থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে গোলাম রব্বানীকে। তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতার আশায় দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে ভোটের মাঠে চষে বেড়াচ্ছেন। তবে এখানে জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে শিল্পপতি ফখরুজ্জামানকে। এ আসনে অন্য বৈধ প্রার্থীরা হলেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের অধ্যাপক গোলজার হোসেন, বাসদের (মার্কসবাদী) বাবুল আখতার, সিপিবির আবু হেলাল, বাসদের মমিনুল ইসলাম, নাগরিক ঐক্যের মোফাখখারুল ইসলাম নবাব ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আনোয়ার হুসাইন।
রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ)
এই আসনটি ছিল ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা স্বামীর এলাকা। ফলে তিনি এখান থেকে বারবার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে এখানে এমপি ছিলেন সাবেক স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরী। এখানে এবার বিএনপি থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে জেলা আহ্বায়ক সাইফুল ইসলামকে। তার ব্যক্তিগত ইমেজ ও দলীয় সমর্থনের কারণে তিনি এলাকায় বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছেন। জামায়াতে ইসলামী থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে মাওলানা নুরুল আমিনকে। জুলাই বিপ্লবের সময় ভূমিকা রাখাসহ বিভিন্ন কারণে তিনি এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয়। এই আসনে দাঁড়িপাল্লা ও ধানের শীষের মধ্যে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে জানান ভোটাররা।
আসনটিতে বৈধ প্রার্থী হিসেবে আরো আছেন, জাতীয় পার্টির নুরে আলম মিয়া, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা সুলতান মাহমুদ, এবি পার্টির ছাদেকুল ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাহবুবুর রহমান ও স্বতন্ত্র আবু জাফর মো. জাহিদ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলনকারী এরফানের মৃত্যুদণ্ড স্থগিত
গুমে জড়িতদের নিয়ন্ত্রণে ছিল বিচারব্যবস্থাও