ইউটিউব-ফেসবুকের ভিডিও দেখে রংপুরে আঙুর চাষে ঝুকঁছেন কৃষকরা। পরীক্ষামূলকভাবে অল্প জমিতে শুরু হলেও সাফল্য ও লাভের সম্ভাবনায় ধীরে ধীরে বাড়ছে বাগানের পরিধি। বসতভিটা ও পতিত জমিতেও আঙুরের আবাদ করে নতুন আয়ের পথ খুঁজছেন কৃষকরা। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বাড়ায় আমদানিনির্ভর এই ফলের বাজারে তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা।
ইউটিউবে ভিডিও দেখে রংপুরের পীরগঞ্জে ৫৫ শতক জমিতে বাগান গড়ে তুলেছেন কৃষক তাওহীদ মিয়া মেজবাউদ্দিন। ২০২৫ সালের শুরুতে মাত্র সাড়ে ৮ শতক জমিতে চাষ শুরু করে ভালো ফলন পান তিনি। লাভজনক হওয়ায় পর্যায়ক্রমে বাগানের পরিধি বাড়ান। বর্তমানে তার বাগানে রয়েছে ২৫ জাতের আঙুরের গাছ। বাগানের আঙুর বিক্রি করে ইতোমধ্যে কয়েক লাখ টাকা আয় করেছেন তিনি।
শুধু আঙুর উৎপাদন নয়, নিজেই চারা উৎপাদন করে বিক্রিও করছেন তাওহীদ। তার নার্সারিতে প্রায় ১০ লাখ টাকা মূল্যের আঙুরের চারা রয়েছে বলে দাবি করেছেন। প্রতিটি চারা ৩০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। তার উদ্যোগ দেখে স্থানীয় অন্য কৃষকরাও আঙুর চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
কৃষি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, চলতি মৌসুমে রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় প্রায় সাড়ে তিন হেক্টর জমিতে আঙুরের আবাদ হয়েছে। বাগানের পাশাপাশি বসতভিটা ও পতিত জমিতেও বাড়ছে এই ফলের চাষ। পরীক্ষামূলক পর্যায় পেরিয়ে ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক উৎপাদনের দিকে এগোচ্ছেন কৃষকরা।
পীরগঞ্জ উপজেলার লালদীঘি বালয়া হাট এলাকার কৃষক তাওহীদ মিয়া মেজবাউদ্দিন জানান, ফেসবুক ও ইউটিউবে আঙুর চাষের বিভিন্ন ভিডিও দেখেই তার আগ্রহ তৈরি হয়। পরে চুয়াডাঙ্গার একটি আঙুর বাগান পরিদর্শন করে সেখান থেকে চারা সংগ্রহ করেন। বাড়ির সাড়ে ৮ শতক জমিতে প্রথমে ওই চারা রোপণ করেন। ফলন ও স্বাদ ভালো হওয়ায় পরে বিভিন্ন এলাকা থেকে বিভিন্ন জাতের চারা সংগ্রহ করেন।
বর্তমানে ২৭ শতক জমিতে ৩২৪টি এবং আরো ২০ শতক জমিতে প্রায় ৩০০টি আঙুর গাছ রয়েছে তার। বাগানে জয় সিডলেস, বাইকনুর, দাসুনিয়া, ভ্যারেজ, গ্রিন লন, জার্মান গ্রিন ও বেলাবোসহ ২৫ জাতের আঙুর রয়েছে।
তাওহীদ মিয়া বলেন, ফেসবুক ও ইউটিউবে আঙুর চাষের ভিডিও দেখে প্রথমে মনে প্রশ্ন জাগে—বাংলাদেশে মিষ্টি আঙুর উৎপাদন সম্ভব কি না। পরে পাশের গ্রামের এক কৃষকের বাগানের ভিডিও দেখে সেখানে যাই। আঙুর খেয়ে স্বাদ ভালো পাওয়ার পর আমাদের এলাকায়ও আঙুর চাষ সম্ভব বলে বিশ্বাস হয়। তখনই বাগান করার সিদ্ধান্ত নিই।
তিনি জানান, ৫৫ শতকের বাগান করতে এখন পর্যন্ত প্রায় এক লাখ ৯৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বাগানের আঙুর বিক্রি করে প্রায় তিন লাখ টাকা আয় করেছেন। পাশাপাশি নার্সারিতে চারা উৎপাদন করছেন। বর্তমানে তার কাছে প্রায় ১০ লাখ টাকা মূল্যের চারা রয়েছে। পাইকারি ক্রেতাদের জন্য দাম কমানোর সুযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
আঙুর চাষের পাশাপাশি ‘মিলনপুর ফারমার্স হাব’ ও ‘মিলনপুর আব্দুল্লাহ নার্সারি’ নামে দুটি উদ্যোগ গড়ে তুলেছেন তাওহীদ। আঙুরের চারা উৎপাদনের পাশাপাশি সেগুলো দিয়ে নতুন বাগান তৈরি এবং অন্য কৃষকদের চাষে উৎসাহিত করছেন তিনি।
তাওহীদের দাবি, বাণিজ্যিক বাগানের পাশাপাশি বাড়ির আঙিনায়ও আঙুর চাষ করা সম্ভব। সঠিক পরিচর্যা করলে ১১ মাস বয়সি একটি গাছ থেকে ১৫ থেকে ১০০ কেজি পর্যন্ত ফলন পাওয়া যেতে পারে। শীতকালে গাছের পাতা ঝরে যাওয়ার পর প্রয়োজন অনুযায়ী কাটিং বা প্রুনিং করলে পরে ভালো ফলন পাওয়া যায়।
তাওহীদের বাগানে বাবার সঙ্গে সময় কাটায় তার ছেলে সামিউল ইসলাম অন্তর। পীরগঞ্জ উপজেলার হাজি বয়েজ উদ্দিন পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিউল জানায়, বাগানের আঙুর মিষ্টি হওয়ায় অনেকেই সেখান থেকে ফল ও চারা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
তবে আঙুরের উৎপাদন বাড়লেও সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, রংপুর অঞ্চলে ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে উঠলে উৎপাদিত আঙুরের বাজার আরো সম্প্রসারিত হতে পারে। এতে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।
রংপুর মহানগর দোকান মালিক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হাজী তানবীর হোসেন আশরাফী বলেন, কৃষকদের আঙুর চাষে উৎসাহিত করতে হবে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব। ভবিষ্যতে দেশে উৎপাদিত আঙুর দিয়েই চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানির সুযোগও তৈরি হতে পারে।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি অফিসের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ইউটিউব ও ফেসবুক দেখে কৃষকদের মধ্যে আঙুর চাষের আগ্রহ বাড়ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তাদের প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। রোগবালাই, পোকামাকড়, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে কৃষকদের সহযোগিতা করা হচ্ছে।
এদিকে, মিঠাপুকুর উপজেলার মিজানুর রহমান ২৫ শতক জমিতে আঙুর চাষ করেছেন। তার বাগানের আঙুরও বাজারে বিক্রি শুরু হয়েছে।
সব মিলিয়ে রংপুরে আঙুর চাষ এখন আর বিচ্ছিন্ন পরীক্ষামূলক উদ্যোগে সীমাবদ্ধ নেই। উৎপাদন, চারা বিক্রি ও নতুন বাগান তৈরির মধ্য দিয়ে এই ফলের বাণিজ্যিক চাষের পরিধি ধীরে ধীরে বাড়ছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

