উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় পর্যাপ্ত এলপিজি মজুত থাকার পরও সিন্ডিকেট করে চার দিন ধরে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখার অভিযোগ উঠেছে কয়েকশ এলপিজি পাম্পের বিরুদ্ধে। বাড়তি দামের আশায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
এতে এলপিজিচালিত ব্যক্তিগত ও ভাড়ায়চালিত যানবাহনের মালিক-চালকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পেয়ে অনেক যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
সরেজমিনে রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামসহ আশপাশের জেলায় শতাধিক এলপিজি পাম্পে সরবরাহ বন্ধ থাকতে দেখা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অধিকাংশ পাম্পে পর্যাপ্ত গ্যাস মজুত রয়েছে। তবু অতিরিক্ত দামের আশায় গ্রাহকদের কাছে গ্যাস বিক্রি করা হচ্ছে না। কিছু পাম্পে তালা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আবার কোথাও মেশিন বিকলের অজুহাত দেওয়া হচ্ছে।
দিনাজপুরের দশ মাইল এলপিজি গ্যাস পাম্পসংলগ্ন কয়েকজন দোকানদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পাম্পে পর্যাপ্ত গ্যাস রয়েছে। সরবরাহ বন্ধের আগের দিনই সেখানে গ্যাসবাহী ট্রাক খালাস করেছে।
তাদের অভিযোগ, বেশি দামে বিক্রির সুযোগ তৈরির পাশাপাশি সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই পাম্প মালিকদের একটি অংশ পরিকল্পিতভাবে সরবরাহ বন্ধ রেখেছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসন কার্যকর অভিযান চালালে কৃত্রিম সংকটের সত্যতা সহজেই বেরিয়ে আসবে। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে বাজারও স্বাভাবিক হবে।
লালমনিরহাট কাকিনা গ্যাস পাম্পের এক কর্মচারী আমার দেশকে বলেন, পাম্পে গ্যাস আছে কিন্তু মালিক বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। কারণ তেলের দাম বেড়েছে এ কারণে গ্যাসের দামও বাড়বে।
গোবিন্দগঞ্জে এলপিজি পাম্প কর্মচারী মুরশিদুল ইসলাম বলেন, পাম্প মালিকের সিদ্ধান্তের বাইরে কর্মচারীরা যেতে পারবে না। রাতের বেলা আমাদের বলা হয়েছে, পাম্পে এলপিজি নেই, ফলে গ্রাহকদের আমরা সেটাই বলছি।
ভাড়ায় চালিত কয়েকজন গাড়িচালক আমার দেশকে বলেন, প্রায় চার দিন ধরে এলপিজি পাম্প মালিকরা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রেখেছেন। এতে তারা চরম সংকটে পড়েছেন। তাদের ভাষ্য, তেলের উচ্চমূল্যের কারণে এলপিজিনির্ভর হয়ে গাড়ি চালান। কিন্তু পাম্পগুলোয় গ্যাস মজুত থাকলেও নানা অজুহাতে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে না।
চালকদের অভিযোগ, কোথাও গ্যাস নেই বলা হচ্ছে, আবার কোথাও মেশিন বিকলের অজুহাত দেওয়া হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে গ্যাস আছে জেনেও অনেক পাম্প থেকে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে।
তাদের দাবি, বাড়তি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিতভাবে সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রশাসন নিয়মিত অভিযান চালালে পাম্প মালিকরা এভাবে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে পারতেন না।
মিঠাপুকুরের হাসনা ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক জগদীশ আমার দেশকে বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে শুধু এলপিজি নয়, পেট্রোল, ডিজেল ও অকটেনও বিক্রি হয়। তিনি দাবি করেন, এলপিজির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তবে মেশিন বিকল থাকায় গ্রাহকদের গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না।
সব পাম্পে সরবরাহ বন্ধের দিনই তাদের মেশিন কীভাবে বিকল হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
বিসমিল্লাহ এলপিজি গ্যাস পাম্পের ব্যবস্থাপক রায়হান কবির আমার দেশকে বলেন, এলপিজির দাম বিভিন্ন সময়ে ৪৩ টাকা থেকে বেড়ে ৮৯ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। পরে কমে বর্তমানে ৭৩ টাকা ৯ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এলপিজিনির্ভর পাম্পগুলো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। ফলে তাদের ব্যবসা পরিচালনায় নানা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর যৌক্তিক কারণ তিনি দেখছেন না।
রংপুর জেলা জজ আদালতের এপিপি আখতারা ওসমানী বলেন, এলপিজি সরবরাহ বন্ধ রেখে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলা হচ্ছে। দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
বদরগঞ্জের মণ্ডলের হাট এলপিজি গ্যাস পাম্পের মালিক আব্দুল ওয়াহেদ জানান, তারা ছোট ব্যবসায়ী এবং সরাসরি কোম্পানি থেকে গ্যাস কিনে থাকেন। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আপাতত গ্যাস দেবে না বলে তাদের জানানো হয়েছে।
তার দাবি, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, অল্প সময়ের মধ্যেই সরকার এলপিজির দাম বাড়াতে বাধ্য হবে। এ কারণেই আপাতত সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে।
আব্দুল ওয়াহেদের অভিযোগ, বড় এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের পাম্পে মজুত রেখেও গ্রাহকদের গ্যাস দিচ্ছে না। পরিকল্পিতভাবে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে দাম বাড়ানোর চেষ্টা চলছে বলেও তিনি দাবি করেন।
রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও বিএনপি মহানগরের আহ্বায়ক শামসুজ্জামান সামু আমার দেশকে বলেন, মজুত থাকার পরও গ্যাস সরবরাহ না করা হলে সংশ্লিষ্টদের চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তিনি পাম্প মালিকদের প্রতি গ্রাহকদের হয়রানি না করার আহ্বান জানান এবং প্রশাসনকে কৃত্রিম সংকটের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ করেন।
রংপুর বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, মজুত থাকার পরও কোথাও এলপিজি সরবরাহ বন্ধ থাকলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, জনগণকে জিম্মি করে কেউ যদি কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ফায়দা লোটার চেষ্টা করে, প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

