চিলমারীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক বদলিতে অনিয়ম

চিলমারীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক বদলিতে অনিয়ম

কুড়িগ্রামের চিলমারীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের আন্তঃউপজেলা (উপজেলার মধ্যে) বদলিতে নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বদলি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে টাকার বিনিময়ে ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রকাশ্য অনিয়মে শিক্ষক বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষক নেতৃবৃন্দ। সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানেও এসব অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে।

বিজ্ঞাপন

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলি কার্যক্রমে চিলমারীর ২৭ জন সহকারী শিক্ষক আন্তঃউপজেলা বদলির জন্য আবেদন করেন। পরে ‘প্রাথমিক শিক্ষক বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তিকরণ বিষয়ক কমিটি’ ১১ জন শিক্ষকের বদলির আদেশ দেয়।

বদলি সংক্রান্ত নথিপত্র এবং আদেশ যাচাই করে দেখা গেছে, ১১ জন শিক্ষকের মধ্যে ৮ জনকেই নীতিমালা লঙ্ঘন করে বদলি করা হয়েছে। এমনকি পূর্বের আদেশের তালিকা পরিবর্তন করে নতুন করে নাম অন্তর্ভুক্ত করারও অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত প্রজ্ঞাপনের পাঁচটি নির্দেশনার মধ্যে চারটি নির্দেশনাই লঙ্ঘন করা হয়েছে। শূন্য পদের বিপরীতে বদলি করার নির্দেশনা থাকলেও প্রকাশিত তালিকায় শূন্য পদ নেই—এমন বিদ্যালয়েও শিক্ষক বদলি করা হয়েছে। সেই সঙ্গে জ্যেষ্ঠতার নিয়মও লঙ্ঘন করা হয়েছে।

তালিকায় ২ নম্বর ক্রমিকে থাকা মোছা. মহসিনা খাতুনকে ঢুষমারা সপ্রবি থেকে সোনারীপাড়া সপ্রবিতে বদলি করা হয়েছে। অথচ ঢুষমারা সপ্রবিতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র তিনজন। এ ক্ষেত্রেও বদলি নীতিমালা ভঙ্গ করা হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

৩ নম্বর ক্রমিকে থাকা মো. বাবলু মিয়াকে নটারকান্দি সপ্রবি থেকে রাণীগঞ্জ মদনমোহন সপ্রবিতে বদলি করা হয়েছে। আটটি অনুমোদিত পদের বিদ্যালয়টিতে কর্মরত ছিলেন চারজন শিক্ষক। একজনকে বদলি করায় ২৩২ শিক্ষার্থীর পাঠদানের জন্য শিক্ষক রয়েছেন মাত্র তিনজন।

মাত্র তিনজন শিক্ষক দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে নাওশালা সপ্রবি। সেখান থেকে ৪ নম্বর ক্রমিকে থাকা মোছা. তামান্না ইসলাম তৃষাকে ফকিরপাড়া সপ্রবিতে বদলি দেখানো হয়েছে। তার বদলিতে জ্যেষ্ঠতাও লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

৫ নম্বর ক্রমিকে থাকা মো. নুর আলমকে গৌড়মোহনহাট সপ্রবি থেকে রাজারভিটা সপ্রবিতে বদলি করা হয়েছে। নীতিমালা ভঙ্গ করে চার শিক্ষকের মধ্য থেকে তাকে বদলি করায় ওই স্কুলের ১৪০ জন শিক্ষার্থী প্রকৃত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই।

৯ নম্বর ক্রমিকে থাকা মো. মোবারক হোসেনকে উত্তর খাউরিয়া সপ্রাবি থেকে মগড়াকুড়া আকন্দপাড়া সপ্রবিতে বদলি করা হয়েছে। ছয়টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বিদ্যালয়টিতে তিনজন শিক্ষক কর্মরত ছিলেন। তাঁদের একজন পিটিআই প্রশিক্ষণে থাকায় বর্তমানে দুজন শিক্ষক দিয়ে ৯০ শিক্ষার্থীর পাঠদান চলছে। এর মধ্যে একজনকে বদলি করায় বিদ্যালয়টির বর্তমান শিক্ষক সংখ্যা মাত্র একজন।

মাত্র দুজন শিক্ষকের স্কুল খোদ্দ বাঁশপাতারী সপ্রবির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ১০ নম্বর তালিকায় থাকা মো. জোনাব আলীকে বদলি করা হয়েছে চর পাত্রখাতা উত্তরপাড়া সপ্রবিতে। তাকে বদলি করায় ওই স্কুলে শিক্ষক থাকল আর মাত্র একজন।

উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুল বারীর আত্মীয় হওয়ায় সমস্ত নিয়মের ঊর্ধ্বে রয়েছেন তালিকার ১১ নম্বরে থাকা মাসুমা আক্তার। মাত্র দুজন শিক্ষকের স্কুল মুদাফৎ কালিকাপুর সপ্রবিতে ১৫৮ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। ডেপুটেশন এবং মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা মাসুমা আক্তারকে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বদলি দেখানো হয়েছে মুদাফৎ থানা সপ্রবিতে।

শুধু তাই নয়, তালিকায় ৮ নম্বরে থাকা মাসুমা আক্তারের স্বামী মনোয়ারুল ইসলামের মাথায়ও আশীর্বাদের ছোঁয়া লেগেছে এই বিএনপি নেতার। নিয়ম ভঙ্গ করে মনোয়ারুল ইসলামকে ছালীপাড়া সপ্রাবি থেকে ডাঙ্গার চর সপ্রবিতে বদলি করা হয়েছে। ছালীপাড়া সপ্রবিতে ১৫১ শিক্ষার্থীর বিপরীতে চারজন শিক্ষক কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকে একজনকে বদলি করায় শিক্ষকসংখ্যা এখন তিনজন।

সমস্ত নীতিমালা ভঙ্গ করে মাসুমা আক্তারের বদলির বিষয়ে চিলমারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার কামরুজ্জামান বলেন, ‘তাকে বিশেষ বিবেচনায় বদলি করা হয়েছে।’

বিশেষ বিবেচনা কী—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুল বারী সাহেবের অনুরোধ ছিল।’

২৪ সেপ্টেম্বর প্রথম বদলির আদেশের কপি প্রস্তুত করা হয়। সেখানে ১১ জনের তালিকায় মাকসুদা আক্তার ও আবুল কাশেমের নাম থাকলেও পরে কোনো এক অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে পাল্টে যায় ওই আদেশের কপি। ২৯ সেপ্টেম্বর আবারও তৈরি করা হয় নতুন আদেশের কপি। সেখানে মাকসুদা আক্তার ও আবুল কাশেমের পরিবর্তে মাসুমা আক্তার ও বাবলু মিয়ার নাম যুক্ত করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, এই দুজনের নাম যুক্ত করার কারণেই আগের আদেশের কপি পরিবর্তন করা হয়।

শিক্ষক বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘কে কোথায় আর্থিক লেনদেন করেছে, বিষয়টি আমার জানা নেই। যেখানে শূন্য পদ রয়েছে, সেখানে নতুন শিক্ষক আসলেই পদায়ন দেওয়া হবে।’

বদলি ও জ্যেষ্ঠতার নিয়ম ভঙ্গের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি।

শিক্ষক বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘ডেপুটেশনে থাকা শিক্ষক, মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা শিক্ষক, জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে না দেওয়া এবং দুজনের মধ্য থেকে একজনকে বদলি করার বিষয়ে নীতিমালা রয়েছে। আমরা সেসব নীতিমালা মেনেই বদলি করেছি।’

এমই

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন