আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

রংপুর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা কার্যালয়

১৫ লাখের বদলে সাত লাখ টাকা ঘুস নিয়ে আসায় আটক

বাদশাহ ওসমানী, রংপুর

১৫ লাখের বদলে সাত লাখ টাকা ঘুস নিয়ে আসায় আটক

রংপুর জেলা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা কার্যালয়ের উপপরিচালক (ডিডি) রোকসানা বেগমকে সাত লাখ টাকা ঘুস দিতে এসে সম্প্রতি আটক হন এক শিক্ষক। তখন তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। তবে পরে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, চাহিদা মোতাবেক ১৫ লাখ টাকার বদলে মাত্র সাত লাখ টাকা নিয়ে আসায় ওই শিক্ষককে পুলিশে দেওয়া হয়।

আটক মাইদুল ইসলাম খান কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার কাজাইকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ওই এলাকার আব্দুল আখের খানের ছেলে।

বিজ্ঞাপন

রংপুর জেলা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা কার্যালয়ের উপপরিচালক রোকসানা বেগমের কার্যালয়ে ঘুসের টাকা নিয়ে এসে আটক হন মাইদুল । পরে তাকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি এ ঘটনা ঘটে।

এ ঘটনার পর গত বুধবার মাইদুলের স্ত্রী জাহানারা বেগম নিজ এলাকায় সংবাদ সম্মেলন করেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, শিক্ষা অফিসের আশরাফ আলীর সঙ্গে আমার স্বামীর কথা হয়েছিল। এ কারণে জমি বন্ধক এবং গরু বিক্রি করে টাকাগুলো নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু টাকা কম হওয়ায় তাকে ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন জাহানারা বেগম।

এদিকে একাধিক সূত্রে জানা গেছে, কাজাইকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক ও তিন কর্মচারীকে এমপিওভুক্ত করার জন্য জেলা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা কার্যালয়ের উপপরিচালক রোকসানা বেগমের কম্পিউটার অপারেটর আশরাফের সঙ্গে ১৫ লাখ টাকার চুক্তি হয়। কিন্তু মাত্র সাত লাখ টাকা নিয়ে আসায় তাকে ধরে পুলিশে দেওয়া হয়।

জেলা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ওই শিক্ষক আশরাফের মাধ্যমে চুক্তি করে টাকা নিয়ে এসেছিলেন। তাদের চুক্তি ঠিক হয়েছিল ১৫ লাখ টাকায়। কিন্তু টাকা কম দেওয়ার কারণেই তাকে ধরিয়ে দেওয়া হয়।

তারা আরো জানান, উপপরিচালক রোকসানা বেগমের সব কাজ করেন কম্পিউটার অপারেটর আশরাফ। এর আগে তিনি বিভিন্ন জায়গায় বদলি হলে আশরাফকে সঙ্গে করে নিয়ে যান। রোকসানা বেগম জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা থাকাকালীন যেখানেই বদলি হয়েছেন, সেখানেই তিনি আশরাফকে সঙ্গে নিয়ে অনেক কাজ করিয়েছেন। এখনো এমপিওভুক্তির কাজ এলে সেগুলো তিনি আশরাফকে দিয়ে করান।

একাধিক কর্মকর্তা বলেন, উপপরিচালক নিজে কোনো টাকা নেন না। আশরাফের মাধ্যমেই সবকিছু করেন। আশরাফের সঙ্গে যারা সম্পর্ক রাখতে পারেন, তাদের কাজগুলোই হয়ে যায়। বিষয়টি তদন্ত করলে আসল ঘটনা বেরিয়ে আসবে বলে জানান তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আঞ্চলিক পরিচালক আমির আলী বলেন, এখানে ডাল মে কুচ কালা হ্যায়। তদন্ত করলে অনেক কিছুই বেরিয়ে আসবে। এর বেশি কিছু বলতে রাজি হননি তিনি।

ঘটনার বিষয়ে রোকসানা বেগম বলেন, ভোটের দুদিন আগে অফিসে এসেছিলেন, এরপর ঘটনার দিন আবার আসেন। আমি তখন তাকে বলি, ‘আপনি তো ভোটের আগে এসেছিলেন, আজ আবার কেন এসেছেন?’ মাঈদুল আমাকে বলেন, ‘ম্যাডাম, আপনার সঙ্গে একটি কথা আছে। আমি বললাম ‘আপনার সঙ্গে তো ভোটের দুদিন আগেই আমার কথা হয়ে গেছে। আবার আজ কীসের কথা বলতে এসেছেন?’ তিনি তখন মোবাইল ফোনে একটি মেসেজ দেখান। সেখানে লেখা ছিল- ‘এক শিক্ষকের জন্য পাঁচ লাখ টাকা ও তিন কর্মচারীর জন্য তিন লাখ টাকা এখানে আছে।’ এ মেসেজ দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম। তখন আমার অফিসের সবাই লাঞ্চে গেছে।

রোকসানা বেগম আরো বলেন, মাঈদুল আমাকে বলেন, ‘আপনার জন্য একটি প্যাকেট নিয়ে এসেছি, ম্যাডাম। এখানে একটি গিফট আছে।’ তখন আমি আমার অফিসের কর্মচারীকে ডেকে বলি, দেখো তো ওই ব্যাগটায় কী আছে? খোলার পর দেখতে পাই সব টাকা। টাকা দেখে আমি রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে ফোন দিয়ে বিষয়টি অবগত করি।

১৫ লাখ টাকা ঘুসের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত রোকসানা বেগম বলেন, কাজাইকাটা স্কুলটি ২০২০ সাল থেকে এমপিওভুক্ত। এখানে দুই-তিনজন কর্মচারী ও একজন শিক্ষকের নাম এমপিওভুক্তিতে আসেনি। তারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন ‌। আমি বলেছিলাম নিয়মের বাইরে যেতে পারব না।

কম্পিউটার অপারেটর আশরাফের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমার নিজের কাজ আমি নিজে করি। আমার চোখ ছাড়া কাউকে বিশ্বাস করি না। কাজ করার সময় কেউ না কেউ তো সহযোগিতা করতেই পারে। এটা দোষের কিছু নয়।

আশরাফের সঙ্গে ওই শিক্ষকের ১৫ লাখ টাকায় চুক্তি ঠিক হয়েছিল কি নাÑজানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি কেমন এটা সবাই জানে। আমার কোনো টাকা-পয়সার দরকার নেই। কেউ কোনোদিন বলতে পারবে না আমি কোনো ঘুস নিয়েছি। এটা কেউ বলে থাকলে প্রমাণ করে দেখাক।

ঘুস দেওয়ার কথা স্বীকার করে মাইদুল ইসলাম বলেন, ভোটের আগেও আমি অফিসে গিয়েছিলাম। তখন না করছিলেন। আমি ভেবেছিলাম কিছু টাকা দিলে হয়তো কাজটা করে দেবেন। সেজন্য ব্যাগে করে সাত লাখ টাকা নিয়ে আসি তাকে দেওয়ার জন্য।

রংপুর জেলা দুদকের উপপরিচালক শাওন মিয়া বলেন, উপপরিচালক রোকসানা বেগম ফোন করে জানান শিক্ষা অফিসে একজন টাকা নিয়ে এসেছেন। এ কথা শুনে আমি একজন অফিসারকে পাঠাই সেখানে। রংপুর কোতোয়ালি থানায় একটি জিডি করা হয়েছে। জিডি অনুযায়ী পুলিশ ব্যবস্থা নিয়েছে। পুলিশ এটি আমাদের কাছে পাঠালে আমরা যেভাবে তদন্ত করা দরকার সেভাবে করব।

এ বিষয়ে রংপুর কোতোয়ালি থানার ওসি শাহাজন আলী বলেন, শিক্ষা অফিসের ডিডি আমাদের ফোন করে ঘুসের বিষয়টি জানান। আমরা সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে দেখতে পাই তার রুমে একজন বসে আছেন কালো ব্যাগ নিয়ে। সেখানে সাত লাখ টাকা পাই। তাকে ৫৪ ধরায় গ্রেপ্তার করা হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন