আজ থেকে ৬৪ বছর আগে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল দিনাজপুর বিসিক শিল্পনগরী । পাঁচ যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আজও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি এই শিল্পাঞ্চল। ধুঁকে ধুঁকে চলছে নগরীর বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান। বেহাল অবস্থার জন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবকেই দায়ী করেছেন ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা। অন্যদিকে বিসিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিভিন্ন সমস্যার ফিরিস্তি কয়েক দফা প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত সমাধান পাওয়া যায়নি। কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ায় দিনাজপুর বিসিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়তে আগ্রহ হারাচ্ছেন নতুন উদ্যোক্তারা।
দিনাজপুর শহরের পুলহাট এলাকায় ১৯৬২ সালে ৩৫.১৪ একর জমির ওপর ৪৫.৫৪ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) দিনাজপুর শিল্পনগরী। ১৯৭২ সালে প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ কাজ শেষ হয়।
প্রতিষ্ঠাকালে ১৮৯টি শিল্প প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসব প্লটের জমির পরিমাণ ২৮.৭৪ একর। এর মধ্যে স্টাফ কোয়ার্টার, নৈবিকের, পানির ট্যাংক ও কবরস্থানে ব্যবহৃত জমির পরিমাণ ১.২৯ একর, রাস্তা, ড্রেন ও কালভার্টের জন্য জমির পরিমাণ ৪.৬৭ একর এবং প্রশাসনিক ভবনের জন্য জমির পরিমাণ ০.৪৪ একর। বরাদ্দ পাওয়া শিল্প প্লটগুলোর মধ্যে রয়েছে—খাদ্যজাত শিল্প, চালকল, ইঞ্জিনিয়ারিং কেমিক্যাল, বনজ, বেকারি, সিলভার, স্বয়ংক্রিয় ময়দা তৈরির কারখানা ও ডাল-তেলের মিল। এসব প্লটে ৫৪টি শিল্প ইউনিটের মধ্যে উৎপাদনে রয়েছে ৫২টি।
ব্যাংকঋণে প্রতিষ্ঠিত এবং পরে ঋণখেলাপি হওয়ায় আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকায় মেসার্স হাবিবা অ্যালুমিনিয়াম ইন্ডাস্ট্রিজ (প্রা.) লিমিটেড ও মেসার্স রুপন অয়েল অ্যান্ড ফিডস (প্রা.) লিমিটেড নামে দুটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
দিনাজপুর বিসিক শিল্প এলাকায় শিল্প প্লটসহ অফিস ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত এ-টাইপ, বি-টাইপ, সি-টাইপ ও ডি-টাইপ—এই চার ধরনের সর্বমোট ১৮৯টি প্লট রয়েছে। ১৫ হাজার বর্গফুটের এ-টাইপের প্লট ৩৩টি, ৯ হাজার বর্গফুটের বি-টাইপের ৪২টি, সাড়ে চার হাজার বর্গফুটের সি-টাইপের ৬৪টি ও ২,২৫০ বর্গফুটের ডি-টাইপের প্লট ৬৫টি।
দিনাজপুর বিসিকের কলকারখানাগুলো মোটামুটিভাবে উৎপাদনে থাকলেও এখানে সীমানা প্রাচীর ও ড্রেনের পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে বৃষ্টি হলেই শিল্প এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বছরজুড়েই শিল্পনগরীর চারপাশ ময়লা-আবর্জনায় ভরে থাকে। এই শিল্পনগরীতে নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় চুরি-ডাকাতির আশঙ্কা প্রকটভাবে রয়েছে।
দিনাজপুর বিসিকের তথ্যানুযায়ী এখানে প্রায় ৪,৮২৫ শ্রমিক-কর্মচারীর কর্মসংস্থান হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ ৩,৩৭৭ জন এবং নারী ১,৪৪৮ জন। তবে বেসরকারি তথ্যানুযায়ী দিনাজপুর বিসিক শিল্পনগরীতে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। এই সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগাতে পারলে এবং বিদ্যমান সমস্যা দূর করতে পারলে এই শিল্পাঞ্চল থেকে আসতে পারে কাঙ্ক্ষিত সুফল।
এই শিল্প ইউনিটগুলোয় মোট বিনিয়োগ ২২৫.৫০ কোটি টাকা এবং বছরে ইউনিটগুলোর মোট উৎপাদন ৩০২.৫৮ কোটি টাকা।
এই শিল্প ইউনিটের মাধ্যমে সরকারি খাতে বছরে আয় হয় ২০১.৫৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে আয়কর/ভ্যাট ১৬৫ লাখ টাকা, টেলিফোন বিল ০.০৩ লাখ টাকা, বিদ্যুৎ বিল ১.৩৫ লাখ টাকা, ভূমি উন্নয়ন কর ৪.২৬ লাখ টাকা, পৌর কর ০.৯০ লাখ টাকা এবং অন্যান্য (সার্ভিস চার্জ ও হস্তান্তর ফি) ৩০ লাখ টাকা।
এখানে কর্মরত শ্রমিক ও এলাকাবাসী জানান, ড্রেনের পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষাকালে যাতায়াতে সমস্যা সৃষ্টি হয়। ব্যাহত হয় পণ্য আনা-নেওয়ার কাজও।
শিল্পোদ্যোক্তারা জানান, বছরে প্রতি বর্গফুটের জন্য সার্ভিস চার্জ ৩.৫০ পয়সাসহ ভ্যাট ও খাজনা বাবদ মোট চার টাকা ৩১ পয়সা দিতে হয়। বিপরীতে কাঙ্ক্ষিত সেবা পান না তারা।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিসিকের এই শিল্পনগরীটি ঢিমেতালে চলেছে। কখনো বড় ধরনের পরিবর্তন বা উন্নতি হয়নি। এখানকার উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা কর্তৃপক্ষকে তাদের সমস্যা জানালেও শুধু আশার বাণী শুনিয়েছে তারা। এ কারণে এখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা ব্যবসা করে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেননি ব্যবসায়ীরা।
ফজলুর রশিদ নামে এক মিল মালিক বলেন, এখানে ব্যবসা করে কখনো কোনো ধরনের সুবিধা পাইনি। বিভিন্ন সমস্যার কথা বিসিক কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও তারা শুধু আশ্বাস দিয়েছে, সমস্যার সমাধান দিতে পারেনি।
ব্যবসায়ীরা জানান, ব্যাংকঋণ সুবিধা ও উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকারি সহযোগিতা পেলে আরো প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে এই শিল্পনগরী।
দিনাজপুর চালকল মালিক গ্রুপের সভাপতি নুরুজ্জামান সরকার বলেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, নিরাপত্তাসহ অন্যান্য সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানে দ্রুত বিসিককে উদ্যোগ নিতে হবে।
দিনাজপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি, আস্করপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও অটো রাইস মিলের মালিক আবু বকর ছিদ্দীক বলেন, এখানে বছরে বছরে সার্ভিস চার্জ বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত কোনো সেবা পাওয়া যায় না। ফলে আগ্রহ হারাচ্ছেন নতুন উদ্যোক্তারা। কাঙ্ক্ষিত সেবা ও সরকারের সহযোগিতা ছাড়া নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা সম্ভব নয়।
দিনাজপুর বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক জাহেদুল ইসলাম বিসিক শিল্পনগরীতে সীমানা প্রাচীর না থাকা, রাস্তা, ড্রেন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ বিদ্যমান সমস্যার কথা স্বীকার করে বলেন, শিল্পনগরীটি সংস্কার করা অবশ্যই প্রয়োজন। তিনি জানান, সীমানা প্রাচীর নির্মাণের জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দের প্রাক্কলন প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে সীমানা প্রাচীর নির্মাণসহ অন্যান্য সমস্যা সমাধান করা হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

