সুনামগঞ্জে ‘আফাল’, আতঙ্কিত হাওরবাসী

জসীম উদ্দিন, সুনামগঞ্জ

সুনামগঞ্জে ‘আফাল’, আতঙ্কিত হাওরবাসী

সুনামগঞ্জের আকাশে কালো মেঘের গর্জন। হাওরে নামছে আষাঢ়ের অবিরাম বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢল। চারদিকে পানি আর পানি। সেই পানিতে ফুঁসছে ঢেউ। স্থানীয়রা সেই ঢেউকে বলে ‘আফাল’। যার তাণ্ডবে হাওরপারের বসতিদের ভিটা ও ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ে। ভেঙে পড়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠান। সেই আফালের আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটে বাসিন্দাদের।

বিজ্ঞাপন

টাঙ্গুয়ার হাওরের ভুক্তভোগী রিপা বেগম বলেন, ‘আমার ঘরখানা কাঁচা। ঘরের পেছনের ভিটা আফালে নিয়ে গেছে। কিছুদূর এগুলেই বসতঘরটা ভেঙে বিলীন হতে পারে। স্বামী একজন জেলে, আফালের কারণে মাছ ধরতে পারছেন না। শ্রম ও উপার্জন হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সরকারি সহায়তা না পেলে কিভাবে চলব এই চিন্তায় আছি।’

তাহিরপুর উপজেলার পাঠাবুকা গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিবছর টাঙ্গুয়ার হাওরের আফালে বাড়ির পেছনের মাটি ধসে পড়ে।। আফাল থেকে বাঁচতে বাঁশ, কচুরিপানা ও মাটির বস্তা ফেলে রাখি। এবার আফাল এসে মাটির বস্তা নিয়ে গেছে। আরো প্রবল বর্ষণ হলে বসতভিটা রক্ষা করা দায় হয়ে পড়বে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে ভাদ্র-আশ্বিনে যে আফাল দেখা যেত, এখন আষাঢ়ের শুরুতেই সেই তাণ্ডব। পাশাপাশি হাওরের নাব্যতা কমে যাওয়া ও হিজল-করচ বন উজাড় হওয়ায় প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়েছে। ফলে ছোট ঢেউও এখন বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে তাহিরপুরে রতনশ্রী গ্রামে আফালের ধাক্কায় পাকা ঘর, বাথরুম, গোয়ালঘর ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে। উপজেলার পাটাবুকা গ্রামে প্রতিদিন বাড়ির উঠোনে, ঘরের পেছনে আঘাত হানছে আফাল । বিশ্বম্ভরপুরের বাহাদুরপুর গ্রামে ২০টি বাড়ি হাওরের ঢেউয়ের আঘাতে বাড়িঘর হুমকির মুখে পড়েছে। গ্রামবাসী বাড়িঘর রক্ষায় বাঁশ ও কচুরিপানা দিয়ে শেষ চেষ্টা করছেন। ধর্মপাশার বালিজুড়ী ইউনিয়নের রাজাপুর, চকিয়াচাপুর, রায়পুর, হিজলা গ্রামে ৫-৭ ফুট উচ্চতায় আফাল বাড়ির দেয়ালে আছড়ে পড়ছে। তাহিরপুর, ধর্মপাশা, মধ্যনগর, দোয়ারাবাজার ও শাল্লায় ক্ষতির চিত্র সবচেয়ে বেশি।

শনির হাওরের শিক্ষক শরীফ উদ্দিন বলেন, ‘ঢেউ বেশি হওয়ায় কেউ স্কুলে আসে না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমন পরিস্থিতি এখন নিয়মিত হচ্ছে। রেসকিউ ব্যবস্থা না থাকলে ভবিষ্যত আরো অন্ধকার।’ যোগাযোগ ভেঙে পড়ায় রোগীদের হাসপাতালে নিতেও চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

মধ্যনগর বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক তিতাস রায় বলেন, ‘হাওর অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করেই শিক্ষা গ্রহণ করে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে তাদের স্কুলে যাতায়াত অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে। হাওরের উত্তাল ঢেউ কিংবা আফালের কারণে অনেক সময় শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে আসতে পারে না। ফলে তাদের পাঠদান ব্যাহত হয় এবং লেখাপড়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।’

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মফিজির রহমান জানান, ‘আফালের তাণ্ডবে খরচার হাওরে বাহাদুর গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিষয়টি আমাদের নজরে এলে তাৎক্ষণিকভাবে বালুর বস্তা ফেলে সমাধান করছি। যেখানেই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা আছে সেখানেই আফাল থেকে সুরক্ষা দিতে প্রশাসন সর্বদা প্রস্তত রয়েছে। এছাড়া কারো যদি আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হয় তাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত আছে। মসজিদের ইমামকে সেই সেবা প্রদানের জন্য গ্রামবাসীকে অবহিত করতে বলা হয়েছে।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এমদাদুল হক বলেন, ছাতক পয়েন্টে ১৫ সেন্টিমিটার বিপৎসীমার উপরে প্রবাহিত হচ্ছে। সুনামগঞ্জ সুরমা নদীর ষোলঘর পয়েন্টে ২৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় পানি কয়েকটি পয়েন্টে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে স্বল্প মেয়াদী বন্যার শঙ্কা আছে। সবাইকে সতর্ক থাকতে আহবান জানিয়েছেন তিনি।

সুনামগঞ্জ এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, সুনামগঞ্জ দুর্যোগ প্রবন এলাকা। এখানে বর্ষা এলে আফালের তাণ্ডবে ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। আফাল থেকে সুরক্ষা পেতে ক্রিলিপ নামে একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। পিডি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সুনামগঞ্জসহ ৫ জেলায় ১১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থ বছরে প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। এটি বাস্তবায়ন হলে হাওরের মানুষ আফাল থেকে সুরক্ষা পাবে।

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান জানান, আফালে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে মেরামত করে দেয়ার জন্য প্রতিটি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)-এর নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছেন তারা। জেলায় ১৩১১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রের প্রয়োজন হলে জনপ্রতিনিধিদের মাইকিং করে সবাইকে জানিয়ে দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

জেডএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন