আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

জুলাই হত্যার আসামি চেয়ারম্যান মুছার প্রভাবে অচল ইউনিয়ন পরিষদ

উপজেলা প্রতিনিধি, ওসমানীনগর (সিলেট)

জুলাই হত্যার আসামি চেয়ারম্যান মুছার প্রভাবে অচল ইউনিয়ন পরিষদ

সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার সাদিপুর ইউনিয়নে দালাল ও জালিয়াত চক্রের দৌরাত্ম্য এবং ধারাবাহিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ইউনিয়ন পরিষদের স্বাভাবিক কার্যক্রম কার্যত ভেঙে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সেবার নামে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অনিয়ম ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছেন জুলাই বিপ্লবের সময়ে ছাত্র হত্যা মামলার আসামি ও যুবলীগ ক্যাডার বর্তমান চেয়ারম্যান সাহেদ আহমদ মুছা—এমন অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের মুখে ছাত্র হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে অল্পদিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান চেয়ারম্যান সাহেদ আহমদ মুছা। মুক্তির পর থেকেই তিনি ইউনিয়ন পরিষদে অনুপস্থিত থেকে সিলেট নগরীর নিজ বাসায় বসেই পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদিন বিকেলে একজন দফাদার ইউনিয়ন পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র নিয়ে চেয়ারম্যানের সিলেটের বাসায় যান। এতে একদিকে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ৩৩ ধারা অনুযায়ী চেয়ারম্যানকে ইউনিয়ন পরিষদে উপস্থিত থেকে দায়িত্ব পালন করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে তা লঙ্ঘন করা হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যেখানে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, সেখানে উল্টো সিলেট শহরে বসে চেয়ারম্যানের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় পরোক্ষ সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে।

এ সুযোগে ইউনিয়ন পরিষদে একাধিক জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। ইউপি সদস্য আছারুন নেছা ও সদস্য মো. স্বপন মিয়ার বিরুদ্ধে উত্তরাধিকার সনদ জালিয়াতির অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলা বর্তমানে পিবিআইয়ে তদন্তাধীন রয়েছে।

সর্বশেষ উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে। গ্রেপ্তার এড়াতে চেয়ারম্যান সাহেদ আহমদ মুছা যুক্তরাজ্য সফরের অজুহাতে আত্মগোপনের উদ্দেশে স্থানীয় সরকার বিভাগে ছুটির আবেদন করেন। নিয়ম অনুযায়ী এসময় প্যানেল চেয়ারম্যান–১ অথবা ২ দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও তারা দুজনই পতিত আওয়ামী লীগের সমর্থক হওয়ায় কৌশলে চেয়ারম্যান একক সিদ্ধান্তে প্যানেল চেয়ারম্যান–৩ আছারুন নেছাকে দায়িত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে অন্যান্য ইউপি সদস্যরা নতুন প্যানেল গঠনের দাবি জানান, কারণ পূর্বেই নতুন প্যানেল গঠনের কথা ছিল।

পুরোনো প্যানেলের সদস্য আছারুন নেছাকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করার লক্ষে চেয়ারম্যান নিজে অফিসে উপস্থিত না হয়ে অনলাইনে (জুম) বৈঠক ডেকে ইউপি সদস্যদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেন। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন না পেয়ে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ২১ জানুয়ারি দুপুরে চেয়ারম্যানের আত্মীয়-স্বজন ও ছাত্রলীগ নেতা সজ্জাদ মিয়া এবং সুফি রাজিবের নেতৃত্বে একদল লোক ইউনিয়ন পরিষদে প্রবেশ করে প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ করে জোরপূর্বক রেজুলেশন বহি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালায়। এসময় ইউপি সদস্য বখতিয়ার হোসেন বাধা দিলে সন্ত্রাসীরা তার ওপরও চড়াও হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং অবরুদ্ধ প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে উদ্ধার করে।

এরপর ২২ জানুয়ারি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিলেট সফরের দিন, কথিতভাবে চেয়ারম্যান গোপনে আবারও ইউনিয়ন পরিষদে উপস্থিত হয়ে রেজুলেশন বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনিক কর্মকর্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করেন এবং সদস্যদের স্বাক্ষর আদায়ের চেষ্টা চালান। তবে চেয়ারম্যানের মনোনীত আছারুন নেছা ও খালিছ মিয়া ছাড়া অন্য কোনো ইউপি সদস্য রেজুলেশনে স্বাক্ষর করতে রাজি হননি। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে অন্য সদস্যরা আসার আগেই চেয়ারম্যান দ্রুত কার্যালয় ত্যাগ করেন।

ইউপি সদস্যদের অভিযোগ, সিলেট শহরে বসে অফিস পরিচালনার সুযোগে চেয়ারম্যানের প্রভাবশালী আত্মীয়-স্বজন দীর্ঘদিন ধরে সাদিপুর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যত কুক্ষিগত করে রেখেছে। ইউপি সদস্য বখতিয়ার হোসেন জানান, এর আগেও দুই দফা চেয়ারম্যানের আত্মীয়-স্বজন পরিষদে হামলা চালিয়েছে।

সাদিপুর ইউনিয়নের প্রশাসনিক কর্মকর্তা অমিত সিংহ বলেন, ঘটনাটি স্বীকার করেন। তবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে চেয়ারম্যান সাহেদ আহমদ মুছার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

এমন পরিস্থিতিতে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি হলেও উপজেলা প্রশাসনের নীরবতা ও কথিত সহযোগিতামূলক ভূমিকা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনমুন নাহার আশা বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...