আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

মন্তব্য প্রতিবেদন

এবারের বিমর্ষ ঈদ

মাহমুদুর রহমান

এবারের বিমর্ষ ঈদ

সারা বিশ্বের মুসলমানদের সবচেয়ে খুশির ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নাম ‘ঈদুল ফিতর’। পবিত্র রমজান মাসের সিয়াম সাধনার পর সব মুসলমানের ঘরে ঈদের প্রভাত অনাবিল আনন্দ নিয়ে আসার কথা। প্রতি চাঁদরাতে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অবিস্মরণীয় কালজয়ী গান ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ শুনলেই তো মন উতলা হয়ে যায়।

কিন্তু এবারের ঈদে মুসলিম জাহানে কোথাও কোনো আনন্দ খুঁজে পাচ্ছি না। চারদিকে কেবল বিষাদের সুর বাজছে। এমনিতেই গত জুলাই মাসে আমার মাকে হারিয়েছি। প্রতিদিন পত্রিকার কাজ শেষে বাড়িতে ফিরেই তার শূন্য ঘরের দিকে চোখ পড়ে। জুলাই বিপ্লবের কল্যাণে তুরস্ক থেকে ছয় বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফিরে আমার মাকে আর সুস্থ পেলাম কই? তারপর কদিন আগে এই রমজান মাসেই আমার স্ত্রীও তার মাকে হারিয়েছেন। সুতরাং নিজের বাড়িতে প্রচণ্ড এক ব্যক্তিগত শোকের আবহ বিরাজ করছে।

বিজ্ঞাপন

আর ওদিকে আমেরিকা ও ইসরাইলি জায়নবাদীরা সব আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে পবিত্র রমজানেই ইরান, লেবানন, ও ফিলিস্তিনে মুসলমানদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। প্রতিবাদহীন সারা বিশ্ব ইসরাইল-আমেরিকা যৌথ হামলায় মুসলমান নিধন দেখে যাচ্ছে। হ্যাঁ, দুনিয়ার তথাকথিত দুইশ কোটি মুসলমানও নির্বিকার! এর আগের রমজানগুলোতে গাজায় একই ধরনের গণহত্যা চলছিল। খেয়াল করলে দেখবেন বেশ কয়েক বছর ধরেই রমজান মাস এলেই জায়নবাদীরা এই হত্যার মৌসুম শুরু করে। কট্টর ইহুদি এবং বর্ণবাদী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি নাকি স্রেফ মজা করার (Just for Fun) জন্য ইরানের নারীদের ওপর বোমা ফেলছেন। (Trump says US may hit Iran’s Kharg Island again ‘just for fun’, 15 March 2026, Aljazeera https://www.aljazeera.com) যদি কোনো মুসলমান রাষ্ট্রপ্রধান ইহুদি কিংবা খ্রিষ্টানদের উদ্দেশ করে এমন উক্তি করতেন, তাহলে তার কী অবস্থা হতো ভাবা যায়?

আমি ব্যক্তি হিসেবে তেমন একটা ধার্মিক নই। মোটামুটি গত তিরিশ বছর ধরে একজন বিশ্বাসী মুসলমানের ফরজ আচারগুলো যথাসম্ভব পালন করার চেষ্টা করলেও মন থেকে আল্লাহর শাস্তির ভয় যায় না। কিন্তু উম্মাহর বিষয়ে আমি বোধহয় অতিমাত্রায় সংবেদনশীল। বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে মুসলমানদের ওপর জুলুম হলে মানসিকভাবে বড় বেশি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। নিজের কিংবা পরিবারের স্বার্থচিন্তা তখন মাথায় থাকে না।

প্রতিপক্ষ যত শক্তিশালী হোক না কেন, এ বিষয়ে কোনো দিন আপস করতে পারিনি। তার ওপর নিপীড়িত মুসলমানের জন্য বেদনা অনুভবের ক্ষেত্রে আমার মনে কখনো শিয়া এবং সুন্নির বিশ্বাসের পার্থক্য কাজ করে না। এমন কোনো ক্ষুদ্র চিন্তার উদয়ই হয় না। হিন্দ রজবের মতো ফিলিস্তিনের ছয় বছরের এক অসহায় সুন্নি শিশু বর্বর ইসরাইলি সৈন্যদের বোমার আঘাতে নিহত হলে কষ্টে যেমন নির্ঘুম রাত কাটাই, একইভাবে আজ যখন আমেরিকান মিসাইলের আঘাতে তেহরানের শিয়া মতাবলম্বী শত শত মুসলমান স্কুল বালিকা নিহত হচ্ছে, তখনও আমার প্রবীণ চোখের অনিয়ন্ত্রিত নোনা পানি ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। মানুষ বুড়ো হলে সামান্যতেই চোখ ভিজে ওঠে। সারা দুনিয়ার মুসলমানদের দুর্দশা দেখে জীবনের ক্রমেই এগিয়ে আসা বিদায়লগ্নে চোখ শুকনো রাখা যাচ্ছে কই?

বিশ্বের প্রায় দুইশ কোটি মুসলমানের চরম পরীক্ষার কালে একটিমাত্র আশার আলো এখনো দেখতে পাচ্ছি। মার্কিন-ইসরাইলি জায়নবাদীদের এত উসকানি সত্ত্বেও শিয়া ও সুন্নির দ্বন্দ্বকে সরাসরি ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে রূপান্তরিত করা সম্ভব হয়নি।

সৌদি আরব এবং আমিরাত তাদের ভূমিতে মার্কিন অ্যাসেট লক্ষ্য করে ইরানের প্রতিরোধ যুদ্ধের নিন্দা জানালেও নিজেরা কোনো আক্রমণে অংশ নেয়নি। বরং উপসাগরীয় দেশ ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াশিংটনকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের চেয়ে ইসরাইল মুসলমানদের অনেক বড় শত্রু। ওমান কট্টর ইহুদিবাদী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিসে’ যোগ দিয়ে ফিলিস্তিন দখলদারিত্বের কোনোরকম বৈধতা দিতে কিংবা বর্ণবাদী ‘সেটলার-কলোনিয়াল স্টেট’ ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতেও অসম্মতি জানিয়েছে। আমিরাত প্রকাশ্যেই ইসরাইলের স্বার্থরক্ষা করে চললেও মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশের শাসককুল দেরিতে হলেও হয়তো বুঝতে পারছেন যে, তাদের নিরাপত্তা নিয়ে ওয়াশিংটন এস্টাবলিশমেন্টের কখনো কোনো মাথাব্যথা ছিল না।

জ্বালানির ভান্ডার পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে গোলাম বানানোই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অভীষ্ট লক্ষ্য। হিটলারের চেয়েও নির্মম গণহত্যাকারী নেতানিয়াহু ইসরাইলকে আঞ্চলিক শক্তি নয়Ñ রীতিমতো বিশ্বশক্তি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে ফেলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্ধ সমর্থনে এক কোটি মানুষের ইসরাইল এবার বিশ্বের সাতশ কোটি মানুষের প্রভু সাজতে চাচ্ছে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আলামত যেন দেখতে পাচ্ছি। সেই আশঙ্কার মধ্যে এবার খানিকটা দেশের কথা বলি।

আমার লেখালেখি জীবন শুরু হওয়ার পর থেকে শুভানুধ্যায়ীরা বড় দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটিয়েছেন। জীবনে লেখার মূল্য তো আর কম দিইনি। এক সামান্য কলম হাতে নিয়ে মিডিয়ায় একরকম একাকী দেশদ্রোহী জেনারেল মইন এবং ফ্যাসিস্ট হাসিনার জামানা পার হয়ে নব্য বিএনপির জামানায় পৌঁছেছি। বিভিন্ন মহল থেকে হঠকারী, মৌলবাদী, ইসলামিস্ট এমন নানা ধরনের খেতাব পেয়েছি।

জেনারেল মইনের আমলে বর্তমান সরকারের অনেক প্রভাবশালী মন্ত্রী যখন হয় জেলে, না হয় আপস করে বাঁচতে চেয়েছেন, কিংবা দেশবিদেশে পালিয়ে বেড়িয়েছেন তখন প্রচণ্ড বৈরী পরিবেশে, বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি অন্যায় মামলার প্রতিবাদস্বরূপ দুদক চেয়ারম্যান জেনারেল হাসান মশহুদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা করেছি। তারপর হাসিনার আমলে মামলা করেছি বিচারপতি নামধারী আওয়ামী পান্ডা শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের বিরুদ্ধে। শুনেছি বিএনপিপন্থি কোনো কোনো আইনজীবীর সঙ্গে মানিকের বেশ সখ্যতাও ছিল।

শেষ পর্যন্ত পরিবারকে বিপদে ফেলে নিজেও দফায় দফায় জেলে গেছি, শারীরিকভাবে আক্রান্ত হয়েছি এবং নির্বাসনে গেছি। আমার সহকর্মী সাংবাদিকরা এক যুগ বেকার থেকেছেন। তাদের মধ্যে অন্তত একজন জেলের ভাত খেয়েছেন, নির্বাসনে গেছেন। রাজনীতিতে সম্পৃক্ত না হয়েও এই ছোট জীবন থেকে কুড়িটা বছর লড়াই করেই চলে গেল। তবে দেশের জন্য আনন্দের কথা হলো যে, পুনরায় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় ফিরতে পারা গেছে। আশা করতে চাই, এবারের গণতান্ত্রিক যাত্রা নিরাপদ ও দীর্ঘ হবে। আমরা ভয়হীন চিত্তে পত্রিকা চালাতে পারব। সবার জন্য ঈদ মোবারক।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন